রায়ান চেরকি হলেন ফরাসি ফুটবলের এমন এক জাদুকরী প্রতিভা, যিনি অলিম্পিক লিওঁর বিখ্যাত একাডেমি থেকে মাত্র ১৬ বছর বয়সে সিনিয়র ফুটবলে পা রেখেছিলেন। বল পায়ে তার অবিশ্বাস্য দুই পায়ের স্কিল, চোখধাঁধানো ড্রিবলিং এবং মাঠের ভেতরের প্রখর ভিশন দিয়ে তিনি খুব দ্রুতই পুরো বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন।
রায়ান চেরকি’র ব্যক্তিগত তথ্য:
|
নাম |
ম্যাথিস রায়ান চেরকি |
|
জন্ম |
১৭ আগস্ট ২০০৩ (বয়স ২২) |
|
জন্মস্থান |
লিওঁ , ফ্রান্স |
|
উচ্চতা |
১.৮০ মিটার (৫ ফুট ১১ ইঞ্চি) |
|
পজিশন |
অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার / উইঙ্গার |
|
ক্লাব ক্যারিয়ার |
লিয়ন বি, লিয়ন এবং বর্তমানে ম্যানচেস্টার সিটি ক্লাবের হয়ে খেলছেন। |
|
আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার |
২০২৫– ফ্রান্স |

ম্যাথিস রায়ান চেরকি ২০০৩ সালের ১৭ আগস্ট ফ্রান্সের লিওঁতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পরিবার মূলত আলজেরিয়ান বংশোদ্ভূত, যা ফরাসি ফুটবলের অনেক কিংবদন্তির যেমন জিনেদিন জিদান ও করিম বেনজেমার সাথেই মিলে যায়। শৈশব থেকেই লিওঁ শহরের ফুটবল সংস্কৃতির মধ্যে বড় হয়েছেন চেরকি। মাত্র সাত বছর বয়সে, ২০১০ সালে তিনি অলিম্পিক লিওঁর বিখ্যাত যুব একাডেমিতে যোগ দেন।
লিওঁর একাডেমিতে রায়ান চেরকিকে একজন সাধারণ ফুটবলার হিসেবে নয়, বরং একজন ‘বিস্ময় বালক’ হিসেবে দেখা হতো। যুব দলের হয়ে খেলার সময় তিনি তার চেয়ে বয়সে ২-৩ বছরের বড় খেলোয়াড়দের অনায়াসে ড্রিবলিং করে পরাস্ত করতেন। মাত্র ১৫ বছর বয়সে তিনি অনূর্ধ্ব-১৯ উয়েফা ইয়ুথ লিগে গোল করে টুর্নামেন্টের ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতার রেকর্ড গড়েন।

২০১৯ সালের অক্টোবরে, মাত্র ১৬ বছর ৬৩ দিন বয়সে দিজন-এর বিরুদ্ধে ম্যাচ দিয়ে লিগ ওয়ানে চেরকির অভিষেক হয়। এর মাধ্যমে তিনি লিওঁ-র ইতিহাসের অন্যতম কনিষ্ঠ ডেব্যুট্যান্টে পরিণত হন। তবে বিশ্ব ফুটবল তার প্রতিভার প্রথম আসল ঝলক দেখে ২০২০ সালের জানুয়ারিতে, ফরাসি কাপের একটি ম্যাচে।
নঁত-এর বিরুদ্ধে ৪-৩ ব্যবধানে জেতা সেই ম্যাচে চেরকি একাই দুটি গোল করেন এবং বাকি দুটি গোলে অ্যাসিস্ট করেন। অর্থাৎ, দলের চারটি গোলের পেছনেই ছিল ১৬ বছরের এই কিশোরের অবদান। সেই রাতে ফরাসি মিডিয়া তাকে নিয়ে মেতে ওঠে এবং রাতারাতি তিনি ইউরোপের লাইমলাইটে চলে আসেন। কিলিয়ান এমবাপে নিজেও টুইট করে এই তরুণ প্রতিভার প্রশংসা করেছিলেন।
অভিষেকের পর রায়ান চেরকির ক্যারিয়ার যতটা মসৃণ হওয়ার কথা ছিল, ততটা হয়নি। লিওঁর কোচ পরিবর্তনের হিড়িক এবং চেরকির কিছুটা অনিয়ন্ত্রিত খেলার ধরনের কারণে তাকে প্রায়ই সাইডলাইনে বসে থাকতে হতো। তবে ২০২২-২৩ মৌসুমে লিওঁর কোচ হিসেবে লঁরা ব্লাঁ দায়িত্ব নেওয়ার পর চেরকির ক্যারিয়ার নতুন মোড় নেয়। ব্লাঁ চেরকিকে উইং থেকে সরিয়ে মাঠের মাঝখানে ‘নাম্বার টেন’ বা সেন্ট্রাল অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার পজিশনে খেলার স্বাধীনতা দেন। এই পজিশনে চেরকি তার সেরাটা দিতে শুরু করেন।

লিওঁর আক্রমণভাগ এখন পুরোপুরি চেরকির পায়ের জাদুর ওপর নির্ভরশীল। দলের প্রধান প্লে-মেকার বা ‘নাম্বার ১০’ পজিশনে খেলে তিনি নিয়মিত অ্যাসিস্ট করছেন এবং নিজে গোল বক্সে ঢুকে নিখুঁত ফিনিশিং দিচ্ছেন। লিগ ওয়ান এবং ইউরোপিয়ান প্রতিযোগিতার বড় ম্যাচগুলোতে চেরকি নিজের সেরাটা দিচ্ছেন। বিশেষ করে বড় দলগুলোর কড়া ডিফেন্স ভেঙে থ্রু-পাস বা ডি-বক্সের ঠিক বাইরে থেকে তার দূরপাল্লার শটগুলো প্রতিপক্ষের জন্য আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
লিওঁর জার্সিতে তার এই দুর্দান্ত ও চোখধাঁধানো পারফরম্যান্সের কারণেই ৩৬ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে ম্যানচেস্টার সিটি চেরকিকে ইতিহাদ স্টেডিয়ামে নিয়ে এসেছে। পেপ গার্দিওলা দীর্ঘদিন ধরেই চেরকির টেকনিক্যাল স্কিল এবং দুই পায়ে সমানভাবে খেলার ক্ষমতার ওপর নজর রাখছিলেন। কেভিন ডি ব্রুইনার উত্তরসূরি এবং সিটির মিডফিল্ডকে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী করতেই চেরকিকে এই দীর্ঘমেয়াদী চুক্তিতে সই করানো হয়েছে।

আন্তর্জাতিক ফুটবল পর্যায়ে রায়ান চেরকি ফ্রান্সের অনূর্ধ্ব-১৬ থেকে শুরু করে অনূর্ধ্ব-২১ এবং অলিম্পিক দলের হয়ে নিয়মিত খেলেছেন। ২০২৪ সালের প্যারিস অলিম্পিকে থিয়েরি অঁরির অধীনে ফ্রান্স অলিম্পিক দলকে রৌপ্য পদক জেতাতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
উয়েফা নেশনস লিগের সেমিফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে ফরাসি জাতীয় দলে রায়ান চেরকির অভিষেক হয়। হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের এই ম্যাচে ফ্রান্স ৫-৪ ব্যবধানে হেরে গেলেও, চেরকি নিজে একটি গোল করেন এবং অন্য একটি গোলে সহায়তা করেন। অভিষেকের ঠিক তিন দিন পর, জার্মানির বিপক্ষে ২-০ গোলে জয় পাওয়া ম্যাচে তিনি প্রথমবারের মতো জাতীয় দলের শুরুর একাদশে সুযোগ পান।
কোচ দিদিয়ের দেশম ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের জন্য যে ২৬ সদস্যের চূড়ান্ত স্কোয়াড ঘোষণা করেছেন, তাতে রায়ান চেরকি সুযোগ পেয়েছেন। বিশ্বকাপে তিনি ২৪ নম্বর জার্সি পরে মাঠে নামবেন। বর্তমানে ম্যানচেস্টার সিটিতে খেলা এই তরুণ অ্যাটাকিং মিডফিল্ডারকে ফ্রান্সের আক্রমণভাগের অন্যতম বড় প্রতিভাবান অস্ত্র হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
Reference:

