Image default
ক্রীড়াবিদজীবনীফুটবল

ডেকলান রাইস: আয়ারল্যান্ডের প্রাক্তন, ইংল্যান্ডের বর্তমান!

ডেকলান রাইস দুটি ভিন্ন দেশের হয়ে সিনিয়র আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার বিরল কীর্তি গড়েছেন। আইরিশ বংশোদ্ভূত হওয়ায় শুরুতে আয়ারল্যান্ডের হয়ে ৩টি ম্যাচ খেললেও, ২০১৯ সালে তিনি বেশ বিতর্কের জন্ম দিয়ে নিজের জন্মভূমি ইংল্যান্ড দলে যোগ দেন। 

ডেকলান রাইস যার জীবনটাই এক অনন্য প্রমাণ যে ব্যর্থতা জীবনের শেষ কথা নয়, বরং এক নতুন মহাকাব্যের শুরু। চেলসির একাডেমি থেকে এক কিশোরের অবহেলিতভাবে বিদায় নেওয়ার গল্পটা আজ ফুটবল বিশ্বের অন্যতম সেরা ঘুরে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণা। ওয়েস্ট হ্যামের হয়ে অধিনায়ক হিসেবে ইউরোপীয় ট্রফি উঁচিয়ে ধরা থেকে শুরু করে এমিরেটস স্টেডিয়ামে আর্সেনালের মাঝমাঠের প্রাণভোমরা হয়ে ওঠা; রাইসের ক্যারিয়ার গ্রাফ কেবলই এক লড়াকু সৈনিকের গল্প বলে। 

ডেকলান রাইস’র ব্যক্তিগত তথ্য:

নাম

ডেকলান রাইস

জন্ম

১৪ জানুয়ারি ১৯৯৯ (বয়স ২৭)

জন্মস্থান

কিংস্টন আপন টেমস , গ্রেটার লন্ডন, ইংল্যান্ড

উচ্চতা

৬ ফুট ২ ইঞ্চি (১.৮৮ মিটার)

পজিশন

মিডফিল্ডার

ক্লাব ক্যারিয়ার

ওয়েস্ট হ্যাম ইউনাইটেড এবং বর্তমানে আর্সেনাল ক্লাবের হয়ে খেলছেন।

আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার

২০১৯– ইংল্যান্ড

ডেকলান রাইস – Image Source: www.bbc.com

১৯৯৯ সালের ১৪ই জানুয়ারি লন্ডনের কিংস্টন আপন টেমসে জন্মগ্রহণ করেন ডেকলান রাইস। তাঁর পরিবার ছিল অত্যন্ত ফুটবলপ্রেমী, যার ফলে খুব ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি ডেকলানের ছিল সহজাত টান। মাত্র সাত বছর বয়সে তিনি লন্ডনের জায়ান্ট ক্লাব চেলসির বিখ্যাত যুব একাডেমিতে যোগ দেন। দীর্ঘ সাত বছর চেলসির একাডেমিতে কঠোর পরিশ্রম করার পর, যখন তাঁর বয়স মাত্র ১৪ বছর, তখন ক্লাব কর্তৃপক্ষ তাঁকে রিলিজ করে দেয়।

একটি কিশোরের জন্য নিজের প্রিয় ক্লাব থেকে বাদ পড়া ছিল এক বিশাল মানসিক ধাক্কা। কিন্তু ডেকলান ভেঙে পড়েননি। নিজের ওপর বিশ্বাস রেখে সেই বছরই তিনি ওয়েস্ট হ্যাম ইউনাইটেডের একাডেমিতে যোগ দেন। চেলসির সেই প্রত্যাখ্যানই যেন ডেকলানের ভেতরের জেদকে বাড়িয়ে দিয়েছিল, যা পরবর্তীতে তাঁকে একজন বিশ্বমানের ফুটবলার হতে সাহায্য করে।

ডেকলান রাইস ওয়েস্ট হ্যাম একাডেমিতে – Image Source: www.teamtalk.com

ওয়েস্ট হ্যামের একাডেমিতে যোগ দেওয়ার পর রাইস খুব দ্রুতই নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন এবং বয়সভিত্তিক দলগুলোর বাধা পেরিয়ে মূল দলে জায়গা করে নেন। ২০১৭ সালের মে মাসে বার্নলির বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে হ্যামার্সদের হয়ে তাঁর পেশাদার ক্যারিয়ার শুরু হয়। শুরুতে সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার বা সেন্টার-ব্যাক হিসেবে খেললেও, রাইসের আসল কার্যকারিতা মাঝমাঠে।

ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে খেলার পর থেকে ডেকলান রাইসের ক্যারিয়ারের গ্রাফ কেবল ওপরের দিকেই উঠেছে। মাঠের চারদিকে ছড়াতে থাকা তাঁর বল কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা, নিখুঁত গেম রিডিং এবং প্রতিপক্ষের আক্রমণ মাঝপথেই নসাৎ করে দেওয়ার দক্ষতা তাঁকে প্রিমিয়ার লিগের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডারে পরিণত করে।

ডেকলান রাইসের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় সাফল্য আসে ২০২৩ সালের জুনে। তাঁর নেতৃত্বে ওয়েস্ট হ্যাম ফাইনালে ফিওরেন্টিনাকে হারিয়ে উয়েফা ইউরোপা কনফারেন্স লিগ শিরোপা জয় করে। এটি ছিল দীর্ঘ ৪৩ বছর পর ক্লাবটির প্রথম কোনো বড় ইউরোপীয় ট্রফি। ওয়েস্ট হ্যামের হয়ে ২৪৫ ম্যাচে তাঁর অসামান্য অবদান ক্লাবটির ইতিহাসে তাঁকে অমর করে রেখেছে।

ওয়েস্ট হ্যাম কনফারেন্স লিগ জয় ২০২৩ – Image Source: www.dailymail.com/

২০২৩ সালের জুলাই মাসে ফুটবল ট্রান্সফার মার্কেটে ঝড় তুলে আর্সেনাল রেকর্ড ১০৫ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে ডেকলান রাইসকে দলে ভেড়ায়। এটি ছিল কোনো ব্রিটিশ ফুটবলারের জন্য তৎকালীন অন্যতম সর্বোচ্চ এবং আর্সেনালের ইতিহাসের সবচেয়ে দামি ট্রান্সফার। এত বিপুল অঙ্কের টাকার চাপ অনেক বড় বড় খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্সে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, কিন্তু রাইস ছিলেন সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম।

এমিরেটস স্টেডিয়ামে পা রেখেই কোচ মিকেল আরতেতার ট্যাকটিক্যাল সিস্টেমে নিজেকে চমৎকারভাবে খাপ খাইয়ে নেন তিনি। প্রথম সিজনেই তিনি গানার্সদের হয়ে অবিশ্বাস্য পারফর্ম করেন এবং ম্যানচেস্টার সিটির সাথে লিগ শিরোপার লড়াইয়ে দলকে শেষ ম্যাচ পর্যন্ত টিকিয়ে রাখেন।

ডেকলান রাইস আর্সেনাল ২০২৩ – Image Source: www.bbc.com

২০২৪-২৫ এবং সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ মৌসুম রাইসের পারফরম্যান্সের গ্রাফ ছিল সবসময় ঊর্ধ্বমুখী। মিকেল আরতেতার অধীনে তিনি কেবল একজন প্রথাগত ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং নিজেকে একজন বিশ্বমানের ‘বক্স-টু-বক্স’ মিডফিল্ডার হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

ডেকলান রাইসের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শুরুটা ছিল কিছুটা নাটকীয়। তাঁর দাদা-দাদি আইরিশ হওয়ার কারণে তিনি অনূর্ধ্ব-১৬, অনূর্ধ্ব-১৯ এবং অনূর্ধ্ব-২১ পর্যায়ে আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্রের হয়ে খেলেছিলেন। এমনকি আয়ারল্যান্ডের জাতীয় দলের হয়ে ৩টি আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচও খেলেন তিনি। তবে ২০১৯ সালে তিনি একটি কঠিন এবং ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত নেন তিনি ইংল্যান্ড জাতীয় দলের হয়ে খেলার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।

ফিফার নিয়মানুযায়ী দল পরিবর্তন করার পর খুব দ্রুতই তিনি গ্যারেথ সাউথগেটের ইংল্যান্ড দলের অপরিহার্য সদস্য হয়ে ওঠেন। উয়েফা ইউরো ২০২০ এবং ইউরো ২০২৪ এই দুটি টুর্নামেন্টেই ইংল্যান্ডের ফাইনালে ওঠার পেছনে জুড বেলিংহ্যামের সাথে মাঝমাঠে রাইসের যুগলবন্দী ছিল দলের মূল শক্তি। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপেও তিনি প্রতিটি ম্যাচে দলের মাঝমাঠ আগলে রেখেছিলেন। বর্তমান কোচ থমাস টুখেলের অধীনেও আসন্ন ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের ট্রফি জয়ের মিশনের মূল চাবিকাঠি থাকবে এই ডেকলান রাইসের হাতেই।

ইংল্যান্ড দলে ডেকলান রাইস – Image Source: www.independent.co.uk

মাঠের বাইরে ডেকলান রাইস অত্যন্ত বিনয়ী ও শান্ত স্বভাবের মানুষ। দীর্ঘদিনের সঙ্গী লরেন ফ্রাইয়ার এবং তাঁদের একটি সন্তান রয়েছে। ভক্তদের সাথে দারুণ সুসম্পর্ক ও বিভিন্ন দাতব্য কাজের কারণে তিনি সবার কাছে এক আদর্শ রোল মডেল। তরুণদের তিনি সবসময় অনুপ্রাণিত করেন এই বলে—ব্যর্থতাই শেষ নয়, ঘুরে দাঁড়ানোটাই আসল। 

Reference:

Related posts

আলেক্স সান্দ্রো: ইউরোপে ব্রাজিলের নীরব রাজা

রায়ান চেরকি: অলিম্পিক জয়ী থেকে ফ্রান্সের জাতীয় দলে

আলবার্তো আকোস্তা: আর্জেন্টিনার নীরব হিরোর গল্প

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More