Image default
ক্রীড়াবিদজীবনীফুটবল

গোলপোস্টের রকেট লঞ্চার এদেরসন মোরায়েস!

এদেরসনের শরীরটা আসলে একটা ফুটবলারের বডি নয়, জ্যান্ত একটা ট্যাটু গ্যালারি! কানের নিচে রোমান্টিক গোলাপ, পিঠে বিশাল ডানাঅলা ঈগল থেকে শুরু করে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ট্রফি সবই তিনি চামড়ায় খোদাই করে রেখেছেন। এমনকি নিজের মনের ভাব প্রকাশ করতে একটা ‘ইমোজি’ ট্যাটুও এঁকে নিয়েছেন! দেখে মনে হয়, সকালে ঘুম থেকে উঠে টুথপেস্ট খোঁজার চেয়ে নতুন ট্যাটু আঁকার জায়গা খোঁজাটাই তাঁর আসল ডেইলি রুটিন!

২০১৭ সালে লিভারপুলের সাদিও মানের বুটের সরাসরি আঘাতে মুখ ফেটে রক্তারক্তি হওয়া এবং ৮টি সেলাই নিয়েও মাত্র এক সপ্তাহের মাথায় হেলমেট পরে মাঠে নেমে পড়া এটাই হলেন এদেরসন মোরায়েস। পায়ের জোড়ে গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ড ভাঙা থেকে শুরু করে ২০২২-২৩ মৌসুমে ম্যানচেস্টার সিটিকে ঐতিহাসিক ট্রেবল জেতানো, এই ব্রাজিলিয়ান প্রতি ম্যাচেই প্রমাণ করেন তিনি কেন অনন্য। আলিসন বেকারের সাথে জাতীয় দলের মধুর প্রতিদ্বন্দ্বিতা সামলে, ইউরোপের ক্লাব ফুটবলে তিনি নিজেকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন যেখানে গোলপোস্টের শেষ প্রহরীই হয়ে ওঠেন আক্রমণের প্রথম উৎস।

এদেরসন মোরায়েস- এর ব্যক্তিগত তথ্য:

নাম

এদেরসন সান্তানা ডি মোরায়েস

জন্ম

১৭ আগস্ট ১৯৯৩ (বয়স ৩২)

জন্মস্থান

ওসাস্কো , ব্রাজিল

উচ্চতা

১.৮৮ মিটার (৬ ফুট ২ ইঞ্চি)

পজিশন

গোলকিপার

ক্লাব ক্যারিয়ার

রিবেইরাও,রিও অ্যাভিনিউ,বেনফিকা,ম্যানচেস্টার সিটি এবং বর্তমানে ফেনারবাহচে ক্লাবের হয়ে খেলছেন।

আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার

২০১৭– ব্রাজিল

এদেরসন মোরায়েস ১৯৯৩ সালের ১৭ই আগস্ট ব্রাজিলের ওসাস্কোতে জন্মগ্রহণ করেন। ব্রাজিলের অধিকাংশ ফুটবলারের মতোই তাঁর শৈশব কেটেছে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে। মজার ব্যাপার হলো, এদেরসন তাঁর ফুটবল ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন একজন লেফট-ব্যাক হিসেবে। কিন্তু তাঁর গতি কম থাকায় এবং গায়ের জোর বেশি থাকায় স্থানীয় কোচ তাঁকে গোলপোস্টের নিচে দাঁড় করিয়ে দেন।

২০০৮ সালে তিনি ব্রাজিলের বিখ্যাত ক্লাব সাও পাওলোর যুব একাডেমিতে যোগ দেন। তবে সেখানে খুব একটা পাত্তা পাননি তিনি। মাত্র ১৬ বছর বয়সে সাও পাওলো তাকে রিলিজ করে দিলে কিশোর এদেরসন মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। কিন্তু হাল ছাড়েননি। সুযোগ আসে পর্তুগাল থেকে। পর্তুগিজ জায়ান্ট বেনফিকার যুব দলে যোগ দিয়ে তাঁর ইউরোপীয় অধ্যায় শুরু হয়।

এদেরসন মোরায়েস
২০০৮ সালে তরুণ গোলরক্ষক এদেরসন – Image Source: static.gazetaesportiva.com

বেনফিকার যুব দল থেকে মূল দলে জায়গা পাওয়া এদেরসনের জন্য সহজ ছিল না। অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য তাকে পর্তুগালের ছোট ক্লাব রিবেইরাও এবং পরবর্তীতে রিও অ্যাভতে খেলতে হয়। রিও অ্যাভের হয়ে দুর্দান্ত পারফর্ম করার পর ২০১৫ সালে বেনফিকা তাকে পুনরায় তাদের মূল দলে ফিরিয়ে আনে।

এদেরসন মোরায়েস
বেনফিকা তরুণ গোলরক্ষক এদেরসন– Image Source: e0.365dm.com

২০১৬ সালে বেনফিকার মূল গোলরক্ষক হুলিও সিজার ইনজুরিতে পড়লে এদেরসন প্রথম একাদশে সুযোগ পান। সুযোগ পেয়েই তিনি তাঁর জাত চেনান। তাঁর অবিশ্বাস্য রিফ্লেক্স এবং বক্সের বাইরে এসে বল ক্লিয়ার করার ক্ষমতার কারণে বেনফিকা সেই মৌসুমে পর্তুগিজ লিগ চ্যাম্পিয়ন হয়। ২০১৭ সালে তিনি বেনফিকাকে ঘরোয়া ডাবল (লিগ ও কাপ) জেতাতে বড় ভূমিকা রাখেন। আর তখনই ইউরোপের বড় বড় ক্লাবগুলোর নজর পড়ে এই ট্যাটু জড়ানো যুবকের ওপর।

২০১৭ সালের গ্রীষ্মে ম্যানচেস্টার সিটির কোচ পেপ গার্দিওলা এক বড় জুয়া খেলেন। তিনি তৎকালীন সময়ে কোনো গোলরক্ষকের জন্য দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ফি ৩৫ মিলিয়ন পাউন্ড দিয়ে এদেরসনকে সিটিতে নিয়ে আসেন। গার্দিওলার এমন একজন গোলকিপার দরকার ছিল, যিনি কেবল গোল ঠেকাবেন না, বরং একজন আউটফিল্ড প্লেয়ারের মতো পায়ে বল নিয়ন্ত্রণে রেখে নিচ থেকে আক্রমণ তৈরি করতে পারবেন। এদেরসন ছিলেন গার্দিওলার সেই স্বপ্নের নিখুঁত বাস্তব রূপ।

এদেরসন মোরায়েস
এদেরসন মোরায়েস ও লাইস মোরায়েস– Image Source: icdn.esteemedkompany.com

সিটিতে যোগ দিয়েই এদেরসন ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। তাঁর আসার পর ম্যানচেস্টার সিটির খেলার ধরন পুরোপুরি বদলে যায়। এদেরসনের শান্ত মেজাজ এবং মাঝমাঠ বরাবর নিখুঁত লং-পাস দেওয়ার ক্ষমতার কারণে সিটি প্রতিপক্ষের হাই-প্রেস খুব সহজেই ভেঙে ফেলতে শুরু করে।

২০২২-২৩ মৌসুমে ম্যানচেস্টার সিটির ঐতিহাসিক ‘ট্রেবল’ (প্রিমিয়ার লিগ, এফএ কাপ এবং চ্যাম্পিয়ন্স লিগ) জয়ের পেছনে এদেরসন ছিলেন অন্যতম মূল নায়ক। বিশেষ করে ইন্টার মিলানের বিপক্ষে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে শেষ মুহূর্তের সেই অবিশ্বাস্য সেভ সিটিকে প্রথমবারের মতো ইউরোপের সেরা মুকুট এনে দেয়।

এদেরসন মোরায়েস
এদেরসন মোরায়েস এর শিরোপা জয় – Image Source: icdn.esteemedkompany.com

ক্লাব ফুটবলে এদেরসন যতটা সফল এবং অপ্রতিদ্বন্দ্বী, ব্রাজিল জাতীয় দলে তাঁর গল্পটা একটু ভিন্ন। একেই বলে ভাগ্যের পরিহাস একই যুগে ব্রাজিলে জন্ম নিয়েছেন ফুটবল বিশ্বের দুই সেরা গোলকিপার লিভারপুলের আলিসন বেকার এবং ম্যানচেস্টার সিটির এদেরসন।

২০১৭ সালে চিলির বিপক্ষে ম্যাচে ব্রাজিলের হয়ে এদেরসনের অভিষেক হয়। কিন্তু এরপর থেকেই আলিসনের সাথে এক নীরব ও মধুর লড়াইয়ে নামতে হয় তাঁকে। অধিকাংশ কোচের প্রথম পছন্দ ছিলেন আলিসন, যার কারণে এদেরসনকে অনেক ম্যাচেই বেঞ্চে বসে থাকতে হয়েছে। তবে কোচের প্রয়োজন অনুযায়ী যখনই তিনি সুযোগ পেয়েছেন, নিজের সেরাটা উজাড় করে দিয়েছেন। ২০২১ কোপা আমেরিকার ফাইনালে তিনি ব্রাজিলের গোলপোস্ট সামলেছিলেন।

পেপ গার্দিওলা ও এদেরসন মোরায়েস– Image Source: s.yimg.com

২০২৬ বিশ্বকাপে ব্রাজিল দলে ভিনিসিয়ুস বা রদ্রিগোরা থাকলেও, আনচেলত্তির ট্যাকটিক্সের আসল প্লে-মেকার কিন্তু এদেরসনই। গোলপোস্টে দাঁড়িয়ে হাত দিয়ে বল ধরার চেয়ে, বাঁ পায়ের জাদুতে মাঝমাঠ বরাবর রকেটের গতিতে বল বাড়িয়ে পাসিং ফুটবলের খাতাটা তিনিই আগে খোলেন।

এদেরসনকে নিয়ে কিছু মজাদার তথ্য

  • এদেরসনের পায়ের জোর কোনো সাধারণ মানুষের পর্যায়ে পড়ে না! ২০১৮ সালে তিনি ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে দূরপাল্লার ড্রপ-কিকের বিশ্বরেকর্ড গড়েন। তাঁর মারা একটি কিক প্রায় ৭৫.৩৫ মিটার দূরত্ব অতিক্রম করেছিল!
  • এদেরসনের শরীরটা আসলে একটা ফুটবলারদের বডি নয়, যেন জ্যান্ত একটা ট্যাটু আর্ট এক্সিবিশন! তাঁর শরীরে ছোট-বড় মিলিয়ে ৪০টিরও বেশি ট্যাটু আছে। কানের নিচে রোমান্টিক গোলাপ, পিঠে বিশাল ডানাঅলা ঈগল থেকে শুরু করে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ট্রফি সবই তিনি শরীরে এঁকে রেখেছেন। এমনকি নিজের ইয়ার্কি মারার স্বভাবের জন্য একটা ‘ইমোজি’ ট্যাটুও খোদাই করে নিয়েছেন!
  • ২০১৭ সালে লিভারপুলের সাদিও মানের বুটের সরাসরি আঘাতে এদেরসনের মুখ ফেটে রক্তারক্তি হয়ে গিয়েছিল। মুখে ৮টি সেলাই পড়ার পরও এই নির্ভীক যোদ্ধা মাত্র এক সপ্তাহ পরেই মাথায় হেলমেট পরে মাঠে নেমে পড়েছিলেন!
  • এদেরসন কিন্তু ছোটবেলায় ফুটবলার হতে চেয়েছিলেন, গোলকিপার নয়। খেলতেন লেফট-ব্যাক পজিশনে। কিন্তু তাঁর ক্ষিপ্রতা কম আর গায়ের জোর বেশি দেখে কোচ একদিন রেগে গিয়ে বলেন, “তুই গিয়ে গোলপোস্টে দাঁড়া!” ব্যস, ফুটবল বিশ্ব পেয়ে গেল এক অনন্য সুইপার-কিপারকে।

Reference:

 

Related posts

রবার্তো আবনদানজিয়েরি: আর্জেন্টিনার বিশ্বস্ত গোলরক্ষক

আশা রহমান

যোগেন মন্ডল- রাজনীতির হারিয়ে যাওয়া নক্ষত্র

ইব্রাহিম ট্রাওরে কে? যিনি পশ্চিমাদের চোখে চোখ রেখে কথা বলেন

শেখ আহাদ আহসান

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More