কোবি মাইনু মাত্র দুই বছর আগেও যিনি ছিলেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড অনূর্ধ্ব-১৮ দলের এক প্রতিভাবান কিশোর, আজ ২০২৬ বিশ্বকাপের মঞ্চে তিনিই ইংল্যান্ডের থ্রি-লায়ন্সদের মাঝমাঠের প্রধান ভরসা। তাঁর ক্যারিয়ারের গ্রাফটা যেন কোনো রকেটের গতিকেও হার মানায়। ঘানার প্রস্তাব ফিরিয়ে ইংল্যান্ডের সাদা জার্সি গায়ে জড়ানো এই তরুণের পায়ের জাদু আজ পুরো ফুটবল বিশ্বকে মুগ্ধ করছে। মাঝমাঠ থেকে বল কেড়ে নিয়ে নিখুঁত পাসিং, আর সুযোগ বুঝে একা পুরো ডিফেন্স চিরে দেওয়া সব মিলিয়ে মাইনুর এই ‘কমপ্লিট প্যাকেজ’ কীভাবে আধুনিক ফুটবলের সংজ্ঞা বদলে দিচ্ছে, তা নিয়েই আমাদের আজকের বিশেষ আয়োজন।
কোবি মাইনু-এর ব্যক্তিগত তথ্য:
|
নাম |
কোবি বোটেং মাইনু |
|
জন্ম |
১৯ এপ্রিল ২০০৫ (বয়স ২১) |
|
জন্মস্থান |
স্টকপোর্ট , গ্রেটার ম্যানচেস্টার, ইংল্যান্ড |
|
উচ্চতা |
৬ ফুট ০ ইঞ্চি (১.৮৪ মিটার) |
|
পজিশন |
মিডফিল্ডার |
|
ক্লাব ক্যারিয়ার |
চিডল ও গেটলি,ফেইলসওয়ার্থ ডায়নামোস এবং বর্তমানে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ক্লাবের হয়ে খেলছেন। |
|
আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার |
২০২৪– ইংল্যান্ড |

২০০৫ সালের ১৯শে এপ্রিল ইংল্যান্ডের স্টকপোর্টে জন্মগ্রহণ করেন কোবি মাইনু। তাঁর বাবা-মা দুজনেই ঘানার বংশোদ্ভূত, যা পরবর্তীতে তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সিদ্ধান্তে এক বড় ভূমিকা রেখেছিল। ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি মাইনুর ছিল এক সহজাত প্রতিভা। স্থানীয় ক্লাব চ্যাডল অ্যান্ড গ্যাটলি জুনিয়র্সের হয়ে খেলার সময় তাঁর অসাধারণ ড্রিবলিং এবং ফুটবল বুদ্ধিমত্তা স্কাউটদের নজর কাড়ে।
মাত্র ৯ বছর বয়সে তিনি ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিখ্যাত যুব একাডেমিতে যোগ দেন। একাডেমির প্রতিটি বয়সভিত্তিক দলে মাইনু ছিলেন সবার চেয়ে আলাদা। সাধারণত তরুণ মিডফিল্ডাররা অনেক বেশি দৌড়াদৌড়ি বা গতি দেখানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু মাইনুর খেলার স্টাইল ছিল একদম শান্ত এবং নিয়ন্ত্রিত। ২০২২ সালের মে মাসে ইউনাইটেডের হয়ে ঐতিহাসিক ‘এফএ ইয়ুথ কাপ’ জয়ে তিনি মাঝমাঠে প্রধান ভূমিকা পালন করেন, যা তাঁকে সরাসরি ক্লাবের মূল দলের দরজায় কড়া নাড়তে সাহায্য করে।

২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে কারাবাও কাপের একটি ম্যাচে চার্লটন অ্যাথলেটিকের বিপক্ষে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মূল দলের হয়ে মাইনুর অভিষেক ঘটে। তবে ২০২৩-২৪ মৌসুমটি ছিল মাইনুর ক্যারিয়ারের আসল ব্রেকথ্রু বা তারকা হয়ে ওঠার বছর। প্রাক-মৌসুম প্রীতি ম্যাচে রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে গোড়ালির ইনজুরিতে পড়ে বেশ কয়েক মাস মাঠের বাইরে থাকতে হলেও, ফিরে এসে তিনি যা করেছিলেন তা রূপকথাকেও হার মানায়।
২৩শে নভেম্বর ২০২৩, গুডিসন পার্কে এভারটনের বিপক্ষে প্রিমিয়ার লিগে নিজের প্রথম ম্যাচেই তিনি ‘ম্যান অফ দ্য ম্যাচ’ নির্বাচিত হন। তৎকালীন ইউনাইটেড ম্যানেজার এরিক টেন হাগ মাইনুর ওপর যে অন্ধবিশ্বাস রেখেছিলেন, মাইনু মাঠে তার প্রতিদান দিতে শুরু করেন। ক্যাসিমিরো বা ক্রিশ্চিয়ান এরিকসেনের মতো অভিজ্ঞ মিডফিল্ডারদের পাশে থেকেও মাইনু নিজের একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেন।
কোবি মাইনুর ক্যারিয়ারের গ্রাফ কতটা দ্রুত ওপরে উঠেছে, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ ২০২৪ সালের এফএ কাপ ফাইনাল। ম্যানচেস্টার সিটির মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে পেপ গার্দিওলার বিশ্বমানের মিডফিল্ডকে একাই স্তব্ধ করে দিয়েছিলেন এই তরুণ। ম্যাচের ৩৯ মিনিটে ব্রুনো ফার্নান্দেজের এক চোখধাঁধানো পাস থেকে মাইনুর করা ঠান্ডা মাথার গোলটি ইউনাইটেডকে ২-১ ব্যবধানে শিরোপা এনে দেয়।

আন্তর্জাতিক ফুটবলে কোবি মাইনুর উত্থান যেন এক রকেট গতিতে হয়েছে। ২০২৪ সালের মার্চ মাসে ইংল্যান্ডের জাতীয় দলে প্রথম ডাক পাওয়ার মাত্র ৩ মাসের মাথায় তিনি ইউরো ২০২৪-এর স্কোয়াডে জায়গা করে নেন। টুর্নামেন্টের শুরুতে শুরুর একাদশে না থাকলেও, নক-আউট পর্ব থেকে গ্যারেথ সাউথগেটের দলের মাঝমাঠের প্রধান ভরসা হয়ে ওঠেন মাইনু। ডেকলান রাইসের সাথে তাঁর পার্টনারশিপ ইংল্যান্ডকে ফাইনালে তুলতে বড় ভূমিকা রাখে।
বর্তমানে চলমান ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপেও কোবি মাইনু থ্রি-লায়ন্সদের মাঝমাঠের অপরিহার্য অংশ। ইংল্যান্ডের বর্তমান কোচ থমাস টুখেলের অধীনে তিনি জুড বেলিংহ্যাম এবং ডেকলান রাইসের সাথে মিলে ইউরোপের অন্যতম সেরা ‘মিডফিল্ড ট্রায়ো’ তৈরি করেছেন। ২০২৬ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিশ্বজয়ের স্বপ্নের পেছনে মাইনুর এই ফর্ম এবং মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণকে সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মাইনুর বাবা ফিলিক্স মাইনু এবং মা আবেবা হেরোল্ড। তাঁরা মূলত ঘানার নাগরিক ছিলেন, কিন্তু পরবর্তীতে ইংল্যান্ডের স্টকপোর্টে এসে স্থায়ী হন। মাইনুর আজকের ফুটবলার হয়ে ওঠার পেছনে তাঁর বাবার অবদান সবচেয়ে বেশি। ছোটবেলায় বাবাই তাঁকে স্থানীয় ক্লাবে নিয়ে যেতেন। বর্তমানে মাইনুর প্রায় প্রতিটি ম্যাচেই তাঁর বাবা-মাকে গ্যালারিতে বসে চিয়ার করতে দেখা যায়।
বাবা-মা ঘানার হওয়ায় ঘানা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন তাকে ঘানা জাতীয় দলের হয়ে খেলার জন্য ব্যাপক চেষ্টা চালিয়েছিল। ঘানার ফুটবল ভক্তরাও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মাইনুকে তাদের দেশের হয়ে খেলার অনুরোধ জানান। তবে ইংল্যান্ডের অনূর্ধ্ব-১৬, ১৭, ১৮ এবং ১৯ দলে খেলা মাইনু শেষ পর্যন্ত থ্রি-লায়ন্সদের সাদামাটা জার্সিকেই বেছে নেন। ইংল্যান্ডের জন্য এই সিদ্ধান্ত কতটা সৌভাগ্যের ছিল, তা মাইনুর বর্তমান পারফরম্যান্সই প্রমাণ করে।

অনেকেই হয়তো জানেন না, মাইনুর পরিবারে তিনিই একমাত্র সেলিব্রিটি নন। তাঁর বড় ভাই জর্ডান মাইনু-হ্যামস ইউকের অত্যন্ত জনপ্রিয় ডেটিং রিয়েলিটি শো ‘লাভ আইল্যান্ড’-এর একজন নামী প্রতিযোগী ছিলেন। জর্ডান পেশায় একজন সফল মডেল ও ইনফ্লুয়েন্সার। মাইনুর আমা ও ইফিয়োমা নামে দুই বোন রয়েছে। পুরো পরিবার মাইনুর ফুটবল ক্যারিয়ার নিয়ে প্রচণ্ড ইমোশনাল এবং ইউনাইটেডের প্রতিটি হোম ম্যাচে পুরো পরিবার ওল্ড ট্রাফোর্ডে হাজির থাকে।
ওল্ড ট্রাফোর্ডের সমর্থকেরা মজা করে বলেন মাইনুর প্রথম এবং একমাত্র প্রেম হলো ওল্ড ট্রাফোর্ডের সবুজ ঘাস আর ফুটবল! পিৎজা খাওয়া আর বন্ধুদের সাথে প্লেস্টেশনে গেম খেলা ছাড়া মাঠের বাইরের মাইনুর জীবন একেবারেই সাদাসিধে।
Reference:

