মাঠে লিসান্দ্রো মার্টিনেজকে দেখলে মনে হয় এই বুঝি প্রতিপক্ষের কারোর ঠ্যাং ভেঙে হাতে ধরায় দিল! হাড়গোড় ভাঙার জন্য যার নাম হয়ে গেছে ‘দ্য বুচার’ বা কসাই, সে নাকি ১৪ বছরের প্রেমিকার সামনে গেলে একদম ‘ভিজে বিড়াল’ হয়ে যায়!
লিওনেল স্কালোনির আর্জেন্টিনা দলের রক্ষণভাগের অন্যতম প্রধান কান্ডারি লিসান্দ্রো মার্টিনেজ। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সেই অবিশ্বাস্য ‘উড়ন্ত ব্লক’ হোক কিংবা ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকায় ইস্পাতকঠিন ডিফেন্ডিং আর্জেন্টিনার আকাশী-সাদা জার্সির প্রতিটি ঐতিহাসিক অর্জনের পেছনে এই বাঁ-পায়ের ডিফেন্ডার ছিলেন এক অপ্রতিরোধ্য প্রাচীর। তার আগ্রাসী খেলার ধরণ, নির্ভীক ট্যাকলিং এবং প্রতিপক্ষকে মাটিতে গুঁড়িয়ে দেওয়ার মানসিকতার কারণে ভক্তরা তাকে ভালোবেসে নাম দিয়েছেন ‘দ্য বুচার’ বা ‘কসাই’।
লিসান্দ্রো মার্টিনেজ-এর ব্যক্তিগত তথ্য:
|
নাম |
লিসান্দ্রো মার্টিনেজ |
|
জন্ম |
১৮ জানুয়ারী ১৯৯৮ (বয়স ২৮) |
|
জন্মস্থান |
গুয়ালেগুয়ে , আর্জেন্টিনা |
|
উচ্চতা |
১.৭৫ মিটার (৫ ফুট ৯ ইঞ্চি) |
|
পজিশন |
সেন্টার-ব্যাক |
|
ক্লাব ক্যারিয়ার |
নিওয়েল’স ওল্ড বয়েজ,ডিফেনসা ওয়াই জাস্টিসিয়া,আয়াক্স এবং বর্তমানে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ক্লাবের হয়ে খেলছেন। |
|
আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার |
২০১৯– আর্জেন্টিনা |

লিসান্দ্রো মার্টিনেজ ১৯৯৮ সালের ১৮ জানুয়ারি আর্জেন্টিনার এনত্রে রিওস প্রদেশের গুয়ালেগুয়াই নামক একটি সাধারণ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার শৈশব কেটেছে চরম দারিদ্র্য ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। একটি ছোট ঘরে যৌথ পরিবারের সাথে বড় হওয়া লিসান্দ্রোর একমাত্র স্বপ্ন ছিল ফুটবলার হওয়া। তার বাবা-মা তাকে ফুটবলের জুতো কিনে দেওয়ার জন্য অনেক কষ্ট করেছেন, যা লিসান্দ্রোকে জীবনের শুরুতেই একজন লড়াকু মানসিকতার মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
মাত্র ১৪ বছর বয়সে তিনি আর্জেন্টিনার বিখ্যাত ক্লাব নিওয়েলস ওল্ড বয়েজের যুব একাডেমিতে যোগ দেন। এই ক্লাবের হয়েই ২০১৬ সালে আর্জেন্টিনার ঘরোয়া লিগে তার পেশাদার ফুটবলে অভিষেক হয়। তবে ক্লাবের মূল দলে নিয়মিত সুযোগ না পাওয়ায় তিনি ২০১৭ সালে ধারে এবং পরবর্তীতে স্থায়ীভাবে আর্জেন্টিনার আরেকটি ক্লাব ডিফেন্সা ওয়াই জাস্টিসিয়ায় যোগ দেন। সেখানে তিনি একজন সেন্টার-ব্যাক হিসেবে নিজের আসল প্রতিভার জানান দেন এবং আর্জেন্টিনার ঘরোয়া ফুটবলে নজর কাড়েন।

২০১৯ সালের মে মাসে ডাচ জায়ান্ট আয়াক্স লিসান্দ্রো মার্টিনেজকে দলে ভেড়ায়। তৎকালীন আয়াক্স কোচ এরিক টেন হাগ লিসান্দ্রোর ভেতরের প্রতিভাকে নিখুঁতভাবে চিনতে পেরেছিলেন। নেদারল্যান্ডসের ইরেডিভিসি লিগে যোগ দেওয়ার পর লিসান্দ্রোকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
আয়াক্সে তিনি শুধু সেন্টার-ব্যাক হিসেবেই খেলেননি, দলের প্রয়োজনে লেফট-ব্যাক এবং ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবেও দুর্দান্ত পারফর্ম করেছেন। তার বল পাসিংয়ের নিখুঁত দক্ষতা এবং ট্যাকটিক্যাল বুদ্ধিমত্তার কারণে তিনি ডাচ ফুটবলে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। আয়াক্সের ভক্তরাই তার আগ্রাসী ডিফেন্ডিং দেখে তাকে প্রথম ‘এল কার্নিসেরো’ বা ‘দ্য বুচার’ নামে ডাকতে শুরু করে।
২০২২ সালের জুলাই মাসে প্রায় ৫৭ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের সফলতম ক্লাব ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে যোগ দেন লিসান্দ্রো মার্টিনেজ। তার প্রিয় কোচ এরিক টেন হাগ ওল্ড ট্রাফোর্ডের দায়িত্ব নেওয়ার পর লিসান্দ্রোকে তার অন্যতম প্রধান অস্ত্র হিসেবে ওল্ড ট্রাফোর্ডে নিয়ে আসেন।
ইংল্যান্ডে পা রাখার পরপরই ব্রিটিশ মিডিয়া এবং সাবেক ফুটবলাররা লিসান্দ্রোর উচ্চতা নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু করেন। স্কাই স্পোর্টসের বিশ্লেষক জেমি ক্যারাঘারের মতো কিংবদন্তিরা দাবি করেছিলেন, প্রিমিয়ার লিগের দীর্ঘদেহী স্ট্রাইকারদের সামনে মাত্র ৫ ফুট ১০ ইঞ্চির একজন সেন্টার-ব্যাক কখনোই টিকতে পারবেন না।
কিন্তু লিসান্দ্রো মার্টিনেজ মাঠের পারফরম্যান্স দিয়ে এই সমস্ত সমালোচনার জবাব দেন। ওল্ড ট্রাফোর্ডের দর্শকরা তার স্লাইডিং ট্যাকল এবং আবেগ দেখে গ্যালারিতে আর্জেন্টিনার পতাকা নিয়ে “আর্-জেন-তিনা! আর্-জেন-তিনা!” স্লোগান দিতে শুরু করে, যা কোনো আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়ের জন্য ওল্ড ট্রাফোর্ডে এক বিরল সম্মান।

২০২৩ সালে কারাবাও কাপ এবং ২০২৪ সালে এফএ কাপ ফাইনালে ম্যানচেস্টার সিটিকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়া ইউনাইটেডের এই সাম্প্রতিক সাফল্যগুলোতে লিসান্দ্রো ছিলেন ডিফেন্সের মূল মেরুদণ্ড। মাঝখানে চোটের কারণে কিছু ম্যাচ মিস করলেও, ২০২৫ এবং ২০২৬ মৌসুমে তিনি পুনরায় ইউনাইটেডের রক্ষণভাগের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে মাঠ মাতাচ্ছেন।
আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের কোচ লিওনেল স্কালোনি ২০১৯ সালের মার্চ মাসে ভেনিজুয়েলার বিপক্ষে এক প্রীতি ম্যাচে লিসান্দ্রো মার্টিনেজের আন্তর্জাতিক অভিষেক ঘটান। আর্জেন্টিনা দলে নিকোলাস ওতামেন্দি এবং ক্রিস্তিয়ান রোমেরোর মতো তারকা সেন্টার-ব্যাক থাকায় লিসান্দ্রোকে প্রায়ই শুরুর একাদশের বাইরে থাকতে হতো, তবে স্কালোনির ট্যাকটিক্যাল চালের সবচেয়ে বড় ‘ট্রাম্প কার্ড’ ছিলেন তিনি।
আর্জেন্টিনার দীর্ঘ ২৮ বছরের শিরোপা খরা কাটানোর ঐতিহাসিক টুর্নামেন্টে তিনি দলের অংশ ছিলেন এবং রক্ষণে ব্যাক-আপ হিসেবে নিজের দায়িত্ব পালন করেন।
কাতার বিশ্বকাপে লিসান্দ্রো মার্টিনেজ আর্জেন্টিনার বিশ্বজয়ের পেছনে এক অলিখিত নায়কের ভূমিকা পালন করেন। বিশেষ করে কোয়ার্টার ফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের শেষ মুহূর্তে আজিজ বেহিচ যখন গোল করার মতো বিপজ্জনক পজিশনে চলে গিয়েছিলেন, তখন লিসান্দ্রোর এক অবিশ্বাস্য উড়ন্ত ব্লক আর্জেন্টহাকে নিশ্চিত গোলের হাত থেকে বাঁচায়। ডাচদের বিপক্ষে ম্যাচেও থ্রি-ম্যান ডিফেন্সে তিনি ছিলেন অসাধারণ।
ওতামেন্দির বয়স বেড়ে যাওয়ায় ২০২৪ কোপা আমেরিকায় লিসান্দ্রো মার্টিনেজ আর্জেন্টিনার মূল একাদশে নিয়মিত সুযোগ পান এবং রোমেরোর সাথে জুটি বেঁধে পুরো টুর্নামেন্টে মাত্র ১টি গোল হজম করে আর্জেন্টিনাকে ব্যাক-টু-ব্যাক কোপা আমেরিকা শিরোপা জেতান।
২০২৬ বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনা শুরু হয়ে গেছে এবং আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগের ‘কসাই’ খ্যাত লিসান্দ্রো মার্টিনেজআবারও আলবিসেলেস্তেদের জার্সিতে বিশ্বজয়ের মিশনে নেমেছেন। কোচ লিওনেল স্কালোনি বিশ্বকাপের জন্য যে ২৬ সদস্যের চূড়ান্ত দল ঘোষণা করেছেন, সেখানে লিসান্দ্রো মার্টিনেজ অবধারিতভাবেই জায়গা করে নিয়েছেন। বরাবরের মতো তাকে ৬ নম্বর জার্সিতেই দেখা যাবে। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে গত মরসুমের ইনজুরি কাটিয়ে তিনি এখন পুরোপুরি ফিট।
২০২৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগ আরও পরিণত। নিকোলাস ওতামেন্দির অভিজ্ঞতার পাশাপাশি লিসান্দ্রো মার্টিনেজ এবং ক্রিস্তিয়ান রোমেরোর জুটিই হবে স্কালোনির মূল শক্তি। তার বাঁ-পায়ের নিখুঁত লং পাসিং আক্রমণভাগের লিওনেল মেসি বা হুলিয়ান আলভারেজদের জন্য বল যোগানে বিশেষ ভূমিকা রাখবে।

২০২২ বিশ্বকাপের সেই অবিশ্বাস্য ‘ফ্লাইং ব্লক’ দিয়ে আর্জেন্টিনাকে বাঁচানো লিসান্দ্রো এবার আরও বড় দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছেন। ভক্তদের প্রত্যাশা, ওল্ড ট্রাফোর্ডের এই ‘কসাই’ তার আগ্রাসী রক্ষণ দিয়ে প্রতিপক্ষ স্ট্রাইকারদের পকেটে পুরবেন এবং আর্জেন্টিনাকে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হতে সাহায্য করবেন।
মাঠে যার অ্যাগ্রেশন দেখে প্রতিপক্ষের হাড়হিম হয়ে যায়, সেই ‘দ্য বুচার’ লিসান্দ্রো মার্টিনেজ ব্যক্তিগত জীবনে কিন্তু দারুণ একজন ফ্যামিলি-ম্যান। লিসান্দ্রোর বাবার নাম রাউল সিলভানো মার্টিনেজ এবং মায়ের নাম মারিয়া দে লস অ্যাঞ্জেলস। লিসান্দ্রোর শৈশব কেটেছে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে। তার পরিবার এনত্রে রিওসের একটি খুব ছোট ঘরে থাকত। তার বাবা একজন সাধারণ শ্রমিক ছিলেন। লিসান্দ্রো প্রায়ই বলেন, তার এই লড়াকু মানসিকতা এসেছে তার মা-বাবার ত্যাগ দেখে। তার একটি বোন রয়েছে যার নাম কান্দেলারিয়া, যাকে তিনি অত্যন্ত স্নেহ করেন।
লিসান্দ্রোর দীর্ঘদিনের সঙ্গিনীর নাম মুরি লোপেজ বেনিতেস। তাদের পরিচয় এবং প্রেমের শুরু যখন লিসান্দ্রোর বয়স ছিল মাত্র ১৪ বছর। তারা দুজন একই শহর বাসিন্দা। লিসান্দ্রো যখন নিওয়েলস ওল্ড বয়েজে যোগ দেওয়ার জন্য বাড়ি ছাড়েন, তখন থেকেই মুরি লোপেজ তার ছায়ার মতো পাশে ছিলেন। তিনি নিজেও একজন পেশাদার কার্নিভাল ড্যান্সার এবং সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার।

লিসান্দ্রো এবং মুরি লোপেজ প্রায় ১০ বছরের বেশি সময় ধরে সম্পর্কে থাকলেও তারা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হননি।
লিসান্দ্রো এবং লোপেজের ছোট পরিবারে একজন বিশেষ সদস্য আছে তাদের পোষা কুকুর পোলো । এটি একটি ফ্রেঞ্চ বুলডগ। লিসান্দ্রো প্রায়ই পোলোর সাথে তার ছুটির দিনের ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করেন।
লিসান্দ্রো মার্টিনেজ এমন একজন মানুষ যিনি প্রমাণ করেছেন যে, ক্যারিয়ারের শুরুতে পাশে থাকা মানুষটিকে সফলতার চূড়ায় পৌঁছেও ভুলে না যাওয়াটাই আসল হিরোইজম। ওল্ড ট্রাফোর্ডের ‘কসাই’ আসলে মনে মনে একজন খাঁটি রোমান্টিক মানুষ!
Reference:

