মাঠে খেলা জেতানো শেষ হলেই যিনি ডিজে আর ড্যান্সার সেজে ড্রেসিংরুম জমিয়ে তোলেন ইব্রাহিমা কোনাতে তো আসলে ফুটবলার কাম পার্ট-টাইম পার্টি মেকার!
গতি, শক্তি আর নিখুঁত ডিফেন্সিভ ট্যাকটিক্স এই তিনের নামই ইব্রাহিমা কোনাতে। আরবি লাইপজিগ থেকে লিভারপুল, কিংবা ফ্রান্স জাতীয় দল যেখানেই গিয়েছেন, নিজের জাত চিনিয়েছেন এই ফরাসি সেন্টার-ব্যাক। প্যারিসের এক সাধারণ কিশোর থেকে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম দামি এবং নির্ভরযোগ্য ডিফেন্ডার হয়ে ওঠার পেছনে কোনাতের যে রোমাঞ্চকর গল্প রয়েছে, তা যেকোনো ফুটবল ভক্তের চোখ জুড়াতে বাধ্য।
ইব্রাহিমা কোনাতে-এর ব্যক্তিগত তথ্য:
|
নাম |
ইব্রাহিমা কোনাতে |
|
জন্ম |
২৫ মে ১৯৯৯ (বয়স ২৭) |
|
জন্মস্থান |
প্যারিস , ফ্রান্স |
|
উচ্চতা |
১.৯৪ মিটার (৬ ফুট ৪ ইঞ্চি) |
|
পজিশন |
সেন্টার-ব্যাক |
|
ক্লাব ক্যারিয়ার |
সোচক্স,আরবি লাইপজিগ এবং বর্তমানে লিভারপুল ক্লাবের হয়ে খেলছেন। |
|
আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার |
২০২২– ফ্রান্স |

ইব্রাহিমা কোনাতে ১৯৯৯ সালের ২৫ মে ফ্রান্সের প্যারিসে জন্মগ্রহণ করেন। তার পরিবার মূলত মালি থেকে ফ্রান্সে অভিবাসী হিসেবে এসেছিল। প্যারিসের ১১তম অ্যারনডিসমেন্টের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে আট ভাইবোনের মধ্যে কোনাতে ছিলেন দ্বিতীয় সর্বকনিষ্ঠ। প্যারিসের অন্যান্য অভিবাসী তরুণদের মতো কোনাতের শৈশবও কেটেছে ফুটবলের প্রতি তীব্র ভালোবাসা নিয়ে।

প্যারিসের রাস্তায় স্ট্রিট ফুটবল খেলতে খেলতেই তার ফুটবলের বুনিয়াদ তৈরি হয়। মজার ব্যাপার হলো, ক্যারিয়ারের শুরুতে কোনাতে কিন্তু ডিফেন্ডার ছিলেন না। শৈশবে তিনি খেলতেন স্ট্রাইকার বা ফরোয়ার্ড পজিশনে। ব্রাজিলের কিংবদন্তি স্ট্রাইকার রোনালদো নাজারিও ছিলেন তার আদর্শ। স্ট্রাইকার হিসেবে খেলার এই অভিজ্ঞতাই পরবর্তীতে তাকে প্রতিপক্ষের ফরোয়ার্ডদের মনস্তত্ত্ব বুঝতে এবং নিচ থেকে বল নিয়ে ওপরে উঠতে দারুণ সাহায্য করেছে।
১১ বছর বয়সে তিনি প্যারিসের স্থানীয় ক্লাব প্যারিস এফসির যুব একাডেমিতে যোগ দেন। সেখানে তিন বছর খেলার পর, তার প্রতিভা নজরে আসে ফরাসি ক্লাব সোশোর। ২০১৪ সালে তিনি সোশোর যুব একাডেমিতে যোগ দেন এবং এখানেই তার পজিশন চিরতরে বদলে যায়। তার উচ্চতা এবং শারীরিক গড়ন দেখে কোচরা তাকে রক্ষণভাগে খেলার পরামর্শ দেন। স্ট্রাইকার থেকে তিনি রূপান্তরিত হন এক দুর্দান্ত সেন্ট্রাল ডিফেন্ডারে।
সোশোর যুব দল থেকে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের মাধ্যমে ২০১৭ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে কোনাতে সিনিয়র দলে অভিষেক করেন। ফরাসি দ্বিতীয় বিভাগের এই ক্লাবের হয়ে মাত্র ১২টি ম্যাচ খেলেই তিনি ইউরোপের বড় বড় স্কাউটদের নজর কাড়েন। বিশেষ করে জার্মানির বুন্দেসলিগার দল আরবি লাইপজিগ কোনাতের ভেতরের সম্ভাবনাকে দ্রুত চিনে নেয়।
২০১৭ সালের গ্রীষ্মকালীন দলবদলে ফ্রি ট্রান্সফারে পাঁচ বছরের চুক্তিতে লাইপজিগে যোগ দেন কোনাতে। জার্মানি গিয়েই তিনি তার জাত চেনাতে শুরু করেন। লাইপজিগের ট্যাকটিক্যাল সিস্টেমের সাথে তিনি দ্রুত মানিয়ে নেন। সেখানে আরেক ফরাসি ডিফেন্ডার দায়ো উপামেকানোর সাথে তার রক্ষণ জুটি ইউরোপের অন্যতম সেরা তরুণ ডিফেন্সিভ জুটি হিসেবে পরিচিতি পায়।
/origin-imgresizer.tntsports.io/2021/03/29/3020001-61955748-2560-1440.jpg)
লাইপজিগের হয়ে তিনি ৯৫টি ম্যাচ খেলেন এবং ক্লাবটিকে বুন্দেসলিগা ও চ্যাম্পিয়ন্স লিগের নকআউট পর্বে নিয়মিত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে গড়ে তুলতে বড় ভূমিকা রাখেন। তবে জার্মানিতে থাকার শেষ দিকে পেশির ইনজুরি তাকে কিছুটা ভুগিয়েছিল, কিন্তু মাঠে নামলেই তিনি ছিলেন অপ্রতিরোধ্য।
২০২১ সালের মে মাসে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের জায়ান্ট ক্লাব লিভারপুল ৩৬ মিলিয়ন পাউন্ড রিলিজ ক্লজ পরিশোধ করে ইব্রাহিমা কোনাতেকে দলে ভেড়ায়। তৎকালীন লিভারপুল ম্যানেজার ইয়ুর্গেন ক্লপ একজন দীর্ঘদেহী, দ্রুতগতির এবং বল-প্লেয়িং ডিফেন্ডার খুঁজছিলেন, যিনি ভার্জিল ভ্যান ডাইকের পাশে দীর্ঘমেয়াদী সঙ্গী হতে পারবেন। কোনাতে ছিলেন ক্লপের সেই নিখুঁত পছন্দ।
লিভারপুলের জার্সিতে কোনাতের শুরুটা ছিল দুর্দান্ত। এফএ কাপ এবং লিগ কাপের শিরোপা জয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ২০২২ সালের উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে লিভারপুল হেরে গেলেও, সেই ম্যাচে কোনাতের ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স ছিল বিশ্বমানের। ভিনিসিয়াস জুনিয়র এবং করিম বেনজেমার মতো তারকাদের তিনি একাই বেশ কয়েকবার রুখে দিয়েছিলেন।

লিভারপুলের সমর্থকরা তাকে আদর করে “ইবু” নামে ডাকেন। অ্যানফিল্ডের বিখ্যাত গ্যালারি থেকে প্রায়ই তার নামে স্লোগান ওঠে। সময়ের সাথে সাথে ইনজুরি কাটিয়ে নিজেকে আরও পরিপক্ব করে তুলেছেন তিনি। বিশেষ করে ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের বর্তমান সময় পর্যন্ত লিভারপুলের রক্ষণভাগকে প্রিমিয়ার লিগের অন্যতম সেরা এবং সবচেয়ে কম গোল হজম করা ডিফেন্সে পরিণত করার পেছনে তার অবদান সিংহভাগ।
ফ্রান্সের বয়সভিত্তিক অনূর্ধ্ব-১৬ থেকে অনূর্ধ্ব-২১ দল পর্যন্ত নিয়মিত খেলেছেন কোনাতে। তবে ২০২২ সালের জুনে উয়েফা নেশনস লিগে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ফ্রান্সের জাতীয় দলের হয়ে তার অভিষেক হয়।

তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ছিল ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ। ইনজুরির কারণে প্রথম সারির বেশ কয়েকজন ডিফেন্ডার ছিটকে গেলে কোচ দিদিয়ের দেশম কোনাতের ওপর আস্থা রাখেন। কোনাতে সেই আস্থার প্রতিদান দেন অবিশ্বাস্যভাবে। তিউনিসিয়া, অস্ট্রেলিয়া এবং বিশেষ করে সেমিফাইনালে মরক্কোর বিপক্ষে তার ডিফেন্সিভ পারফরম্যান্স ছিল চোখে পড়ার মতো। মরক্কোর একের পর এক আক্রমণ যেভাবে তিনি ঠাণ্ডা মাথায় ক্লিয়ার করছিলেন, তা দেখে ফুটবল বিশ্ব তাকে ফ্রান্সের ভবিষ্যৎ রক্ষণের নেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
যদিও ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ফ্রান্স টাইব্রেকারে হেরে রানার্স-আপ হয়, কিন্তু পুরো টুর্নামেন্টে কোনাতের পারফরম্যান্স ছিল সম্পূর্ণ নিখুঁত। ২০২৪ সালের ইউরো কাপ এবং পরবর্তী ২০২৬ বিশ্বকাপের বাছাইপর্বের ম্যাচগুলোতেও ফ্রান্সের রক্ষণভাগের অন্যতম প্রধান ভরসা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তিনি।

২০২৬ সালের এই মহা-উত্তেজনার বিশ্বকাপে ফ্রান্স জাতীয় দলের রক্ষণভাগের সবচেয়ে বড় এবং নির্ভরযোগ্য অস্ত্রের নাম ইব্রাহিমা কোনাতে। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে রানার্স-আপ হওয়ার ক্ষত ভুলে এবার আমেরিকার মাটিতে ট্রফি পুনরুদ্ধারের মিশনে নেমেছে দিদিয়ের দেশমের দল। আর এই মিশনের ডিফেন্স লাইনের মূল চাবিকাঠি রয়েছে অ্যানফিল্ডের এই মহাতারকার হাতেই।
রাফায়েল ভারানের আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায়ের পর ফ্রান্সের ডিফেন্সে যে নেতৃত্বের শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, ২০২৬ বিশ্বকাপে এসে কোনাতে তা পুরোপুরি নিজের করে নিয়েছেন। বর্তমানে ২৬ বছর বয়সী কোনাতে তার ক্যারিয়ারের সেরা সময়ে আছেন। উইলিয়াম সালিবা এবং দায়ো উপামেকানোর সাথে তার রক্ষণ জুটি প্রতিপক্ষের স্ট্রাইকারদের জন্য এক দুর্ভেদ্য প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শুধু মাঠের ডিফেন্সেই নয়, বিশ্বকাপের মতো হাই-প্রেসার টুর্নামেন্টে ড্রেসিংরুমের পরিবেশ হালকা রাখতে কোনাতের জুড়ি মেলা ভার। ম্যাচ জেতার পর ড্রেসিংরুমে তার নাচ আর ডিজে গিরি ফরাসি শিবিরের ক্লান্তি দূর করে নতুন এনার্জি জোগাচ্ছে।
২০২৬ বিশ্বকাপে কিলিয়ান এমবাপ্পেরা যদি ফ্রান্সকে আরেকটি সোনালী ট্রফি এনে দিতে চান, তবে পেছনের দিকটা সম্পূর্ণ নিরাপদ রাখার দায়িত্ব এই ফরাসি ‘ইবু’ ভাইয়ের কাঁধেই। চলতি বিশ্বকাপে তার পারফরম্যান্সই প্রমাণ করছে যে তিনি শুধু বর্তমানের সেরা নন, বরং ইতিহাসের অন্যতম সেরা ডিফেন্ডার হওয়ার পথেই হাঁটছেন।
ইব্রাহিমা কোনাতে সম্পর্কে মজার তথ্য
১. কোনাতের সবচেয়ে বড় ডাই-হার্ড সিক্রেট হলো তিনি জাপানি অ্যানিমের চরম ভক্ত। তার সবচেয়ে প্রিয় অ্যানিমে হলো ‘অ্যাটাক অন টাইটান’ , ‘ড্রাগন বল জেড’ এবং ‘ওয়ান পিস’!
২. যে কোনাতে আজ বিশ্বের বড় বড় ফরোয়ার্ডদের গোল করতে দেন না, ক্যারিয়ারের শুরুতে তিনি নিজেই ছিলেন একজন স্ট্রাইকার!
৩. কোনাতে প্যারিসের এক বিশাল যৌথ পরিবারে বড় হয়েছেন। তার বাবা-মা মূলত আফ্রিকার দেশ মালি থেকে ফ্রান্সে অভিবাসী হিসেবে এসেছিলেন। কোনাতে তার আট ভাইবোনের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বকনিষ্ঠ।
৪. যেহেতু কোনাতের পরিবার মালি থেকে ফ্রান্সে এসেছিল, তাই আন্তর্জাতিক ফুটবলে তার সামনে মালির হয়ে খেলার সুযোগ ছিল!
৫. লিভারপুল এবং ফ্রান্স দুই দলের ড্রেসিংরুমেই কোনাতে তার হাসিখুশি এবং মজার ব্যক্তিত্বের জন্য দারুণ জনপ্রিয়। ম্যাচ জয়ের পর ড্রেসিংরুমে নাচ গান করা এবং গান বাজানোর দায়িত্ব প্রায়ই কোনাতের কাঁধে থাকে!
৬. ২০২৪-২৫ মৌসুমের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ম্যাচের আগে কোনাতে যখন অ্যানফিল্ড স্টেডিয়ামে প্রবেশ করছিলেন, তখন তার পরনে ছিল একটি চমৎকার ডিজাইনার স্যুট এবং চোখে সানগ্লাস। তার সেই ‘ফ্যাশন স্টেটমেন্ট’ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এতটাই ভাইরাল হয়েছিল যে ভক্তরা তাকে ফুটবলের পাশাপাশি ফ্যাশন আইকন হিসেবেও গণ্য করা শুরু করেন।
Reference:

