শৈশবে আলেকজান্ডার নুবেল যখন ফুটবল শুরু করেন, তখন তিনি গোল ঠেকাতেন না, বরং প্রতিপক্ষের জালে গোল বন্যা বইয়ে দেওয়া স্ট্রাইকার ছিলেন! কিন্তু বিধাতার কী লিখন, ৬ ফুট ৪ ইঞ্চির এই লম্বা চওড়া ছেলেটাকে কোচ একদিন জোর করে গোলপোস্টে দাঁড় করিয়ে দিলেন, আর জার্মানি পেয়ে গেল তার ভবিষ্যৎ প্রাচীর। পায়ের কাজ যার এখনো একজন নিখুঁত মিডফিল্ডারের মতো, সেই ‘পার্ট-টাইম স্ট্রাইকার ও ফুল-টাইম কিপার’ নুবেলের উত্থান-পতনের রোমাঞ্চকর কাহিনী নিয়ে আমাদের আজকের এই বিশেষ আয়োজন।
আলেকজান্ডার নুবেল’র ব্যক্তিগত তথ্য:
|
নাম |
আলেকজান্ডার নুবেল |
|
জন্ম |
৩০ সেপ্টেম্বর ১৯৯৬ (বয়স ২৯) |
|
জন্মস্থান |
প্যাডারবর্ন , জার্মানি |
|
উচ্চতা |
১.৯৩ মিটার (৬ ফুট ৪ ইঞ্চি) |
|
পজিশন |
গোলরক্ষক |
|
ক্লাব ক্যারিয়ার |
এসসি প্যাডারবর্ন,শালকে ০৪ II,শালকে ০৪,বায়ার্ন মিউনিখ,মোনাকো এবং বর্তমানে ভিএফবি স্টুটগার্ট ক্লাবের হয়ে খেলছেন। |
|
আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার |
২০২৪– জার্মানি |

১৯৯৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর জার্মানির প্যাডারবোর্নে জন্মগ্রহণ করেন আলেকজান্ডার নুবেল। মজার ব্যাপার হলো, শৈশবে তিনি গোলকিপার হিসেবে ফুটবল শুরু করেননি। টিএসভি টুডর্ফ এবং পরবর্তীতে এসসি প্যাডারবোর্নের যুব দলে খেলার সময় তিনি ছিলেন একজন পুরোদস্তুর আউটফিল্ড স্ট্রাইকার বা মিডফিল্ডার! তার পায়ের কাজ এবং বলের ওপর নিয়ন্ত্রণ চমৎকার ছিল। তবে পরবর্তীতে তার দারুণ রিফ্লেক্স এবং দীর্ঘ শারীরিক গঠনের কারণে কোচরা তাকে গোলপোস্টের নিচে দাঁড় করান।
২০১৫ সালে নুবেল জার্মানির বিখ্যাত ক্লাব শালকে ০৪-এ যোগ দেন। এই শালকে ক্লাবটিই কিন্তু এর আগে ম্যানুয়েল নয়ারকে বিশ্ব ফুটবলের কাছে উপহার দিয়েছিল। ২০১৮-১৯ মৌসুমে ক্লাবের এক নম্বর কিপার রালফ ফারম্যান ইনজুরিতে পড়লে মাত্র ২২ বছর বয়সী নুবেলের অভিষেক হয়।
নিজের অবিশ্বাস্য শট-স্টপিং এবং নিখুঁত পাসিং দিয়ে আলেকজান্ডার নুবেল দ্রুতই বুন্দেসলিগার নজর কাড়েন। ২০১৯ সালের আগস্টে মাত্র ২৩ বছর বয়সে নুবেলকে শালকে ০৪-এর প্রধান অধিনায়ক করা হয়। ফুটবল বিশ্লেষকরা তাকে সরাসরি ‘The Next Neuer’ উপাধিতে ভূষিত করেন, কারণ তার খেলার ধরণ এবং শালকে থেকে উত্থানের গল্পটা হুবহু নয়ারের মতোই ছিল।
২০২০ সালের জুলাই মাসে আলেকজান্ডার নুবেল ফ্রি ট্রান্সফারে জার্মানির সবচেয়ে বড় ক্লাব বায়ার্ন মিউনিখে যোগ দেন। বায়ার্ন বোর্ডের পরিকল্পনা ছিল স্পষ্ট তারা নুবেলকে কিনেছিলেন ম্যানুয়েল নয়ারের দীর্ঘমেয়াদী উত্তরসূরি হিসেবে। চুক্তি অনুযায়ী নুবেলকে প্রতি মৌসুমে নির্দিষ্ট সংখ্যক ম্যাচ খেলানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি। ম্যানুয়েল নয়ার তার জায়গা ছাড়তে এক চুলও রাজি ছিলেন না। নয়ারের অনমনীয় মনোভাব এবং দুর্দান্ত ফর্মের কারণে নুবেল বায়ার্নের প্রথম মৌসুমে মাত্র ৪টি অফিসিয়াল ম্যাচ খেলার সুযোগ পান। বেঞ্চে বসে থেকে একজন তরুণ গোলকিপারের ক্যারিয়ারের ধার কমে যাচ্ছিল। বায়ার্নে যাওয়ার এই সিদ্ধান্তকে অনেকে নুবেলের ক্যারিয়ারের জন্য একটি ‘ভুল পদক্ষেপ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন।
নিজের খেলার খিদে মেটাতে এবং ফর্ম ফিরে পেতে আলেকজান্ডার নুবেল লোনে অন্য ক্লাবে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। আর এই সিদ্ধান্তই তার ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
নুবেল দুই বছরের লোনে ফরাসি ক্লাব এএস মোনাকোতে যোগ দেন। ফ্রান্সের লিগ ওয়ানে তিনি টানা দুই মৌসুম মোনাকোর এক নম্বর কিপার হিসেবে খেলেন এবং মোট ৯৭টি ম্যাচ খেলেন। মোনাকোর রক্ষণভাগকে একা হাতে সামলে তিনি ইউরোপীয় ফুটবলে নিজের হারিয়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাস ফিরে পান।

২০২৩ সালে বায়ার্ন মিউনিখ নুবেলকে আবারও লোনে পাঠায় তবে এবার জার্মানির চেনা মাঠ ভিএফবি স্টুটগার্টে । আর স্টুটগার্টে এসেই নুবেল যা করলেন, তা বুন্দেসলিগার ইতিহাসে রূপকথা হিসেবে লেখা থাকবে।
২০২৩-২৪ মৌসুমে স্টুটগার্টকে বুন্দেসলিগায় রানার্স-আপ করিয়ে সরাসরি উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগে নিয়ে যাওয়ার পেছনে আলেকজান্ডার নুবেল ছিলেন প্রধানতম নায়ক। বায়ার্ন মিউনিখকে টপকে স্টুটগার্টের এই ঐতিহাসিক সাফল্যের পর ক্লাব কর্তৃপক্ষ তার লোনের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সাল পর্যন্ত নিশ্চিত করে। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ মৌসুমেও নুবেল বুন্দেসলিগায় ১১টি ক্লিন শিট রেখে লিগের অন্যতম সেরা গোলকিপার নির্বাচিত হয়েছেন।
জার্মানি জাতীয় দলের জুনিয়র পর্যায়ে (অনূর্ধ্ব-২১) আলেকজান্ডার নুবেল ১৭টি ম্যাচ খেলেছেন এবং ২০১৯ সালের অনূর্ধ্ব-২১ ইউরো কাপে জার্মানিকে ফাইনালে তুলে টুর্নামেন্টের সেরা কিপার হয়েছিলেন। তবে জাতীয় দলে নয়ার এবং টের স্টেগেনের উপস্থিতির কারণে তাকে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হয়েছে।
বর্তমানে ২০২৬ বিশ্বকাপের স্কোয়াডে নুবেল জার্মানি দলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। মার্ক-আন্দ্রে টের স্টেগেনের ইনজুরি এবং ৪০ বছর বয়সী ম্যানুয়েল নয়ারের ক্যারিয়ারের শেষলগ্নে এসে আলেকজান্ডার নুবেল নিজেকে জার্মানির পরবর্তী ‘লং-টার্ম নাম্বার ওয়ান’ হিসেবে প্রমাণ করার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। কোচ জুলিয়াননাগেলসম্যানের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায় নুবেলই হতে যাচ্ছেন জার্মানির প্রধান ভরসা।
বায়ার্ন মিউনিখ আলেকজান্ডার নুবেলের চুক্তি ২০২৯ সাল পর্যন্ত নবায়ন করে রেখেছে। ২০২৬ সালে স্টুটগার্টের লোন পিরিয়ড শেষ হওয়ার পর ম্যানুয়েল নয়ার পুরোপুরি বিদায় নিলে নুবেলই হতে যাচ্ছেন বায়ার্নের এক নম্বর গোলকিপার।
Reference:

