কাতার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে লিওনেল মেসির সেই অবিশ্বাস্য ‘নো-লুক’ পাস এবং একজন ডিফেন্ডার হয়েও স্ট্রাইকারদের মতো নিখুঁত ফিনিশিং! দৃশ্যটা মনে পড়লেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে নাহুয়েল মোলিনার নাম। আর্জেন্টিনার ৩৬ বছরের বিশ্বকাপ খরা কাটানোর অন্যতম প্রধান নায়ক এবং ডান প্রান্তের এই অতন্দ্র প্রহরী বর্তমান ফুটবল বিশ্বের অন্যতম সেরা রাইট-ব্যাক।
নাহুয়েল মোলিনা’র ব্যক্তিগত তথ্য:
|
নাম |
নাহুয়েল মোলিনা লুসেরো |
|
জন্ম |
৬ এপ্রিল ১৯৯৮ (বয়স ২৮) |
|
জন্মস্থান |
এম্বাসে , কর্ডোবা , আর্জেন্টিনা |
|
উচ্চতা |
১.৭৫ মিটার (৫ ফুট ৯ ইঞ্চি) |
|
পজিশন |
রাইট-ব্যাক |
|
ক্লাব ক্যারিয়ার |
বোকা জুনিয়র্স,ডিফেনসা ই জাস্টিসিয়া,রোজারিও সেন্ট্রাল,উদিনেস এবং বর্তমানে অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ ক্লাবের হয়ে খেলছেন। |
|
আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার |
২০২১– আর্জেন্টিনা |

১৯৯৮ সালের ৬ এপ্রিল আর্জেন্টিনার কর্ডোবা প্রদেশের এমবালসে নামক এক ছোট এবং ছিমছাম শহরে জন্মগ্রহণ করেন নাহুয়েল মোলিনা লুসেরো। ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি তার অগাধ প্রেম ছিল। অন্য আট-দশটি আর্জেন্টাইন শিশুর মতো তিনিও রাস্তায় ফুটবল খেলে বড় হয়েছেন। তার ফুটবল প্রতিভার প্রথম স্ফুরণ ঘটে যখন তিনি স্থানীয় একটি ক্লাবে খেলা শুরু করেন।
পরবর্তীতে তিনি ‘প্রজেক্ট বার্সেলোনা’ নামক একটি ফুটবল একাডেমিতে যোগ দেন, যা আর্জেন্টিনায় বার্সেলোনার একটি শাখা ছিল। সেখানে তিনি ফুটবলের মৌলিক কৌশলগুলো গভীরভাবে রপ্ত করার সুযোগ পান। খুব দ্রুতই তার অসামান্য গতি এবং বল নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা স্কাউটদের নজরে আসে এবং তিনি আর্জেন্টিনার অন্যতম জনপ্রিয় ও সফল ক্লাব বোকা জুনিয়র্সের যুব একাডেমিতে ডাক পান।
বোকা জুনিয়র্সের মতো বিশাল ক্লাবে নিজের জায়গা পাকা করা যেকোনো তরুণ খেলোয়াড়ের জন্যই কঠিন। ২০১৬ সালে বোকা জুনিয়র্সের মূল দলে মোলিনার অভিষেক হলেও, দলে নিয়মিত সুযোগ পাওয়া তার জন্য এক প্রকার অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। মূল একাদশে নিয়মিত খেলার সুযোগ না পাওয়ায় তার ক্যারিয়ার কিছুটা থমকে যাওয়ার উপক্রম হয়।
তবে নাহুয়েল মোলিনা হাল ছাড়ার পাত্র ছিলেন না। নিজের স্কিল এবং ম্যাচ ফিটনেস ধরে রাখার জন্য তিনি ধারে অন্য ক্লাবে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ২০১৮ সালে তিনি ধারে ডিফেনসা ই জাস্টিসিয়ায় যোগ দেন। সেখানে তিনি নিয়মিত খেলার সুযোগ পান এবং নিজের আত্মবিশ্বাস ফিরে পান। ২০১৯ সালে তিনি রোজারিও সেন্ট্রালে ধারে খেলতে যান। সেখানেও তিনি ধারাবাহিকভাবে ভালো পারফর্ম করেন।

২০২০ সালে বোকা জুনিয়র্সের সাথে তার চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। চুক্তি নবায়ন নিয়ে ক্লাবের সাথে বনিবনা না হওয়ায় তিনি ফ্রি এজেন্ট হিসেবে ইউরোপে পাড়ি জমানোর দুঃসাহসিক সিদ্ধান্ত নেন।
২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে ইতালীয় ক্লাব উডিনেস নাহুয়েল মোলিনাকে কোনো ট্রান্সফার ফি ছাড়াই দলে ভেড়ায়। বোকা জুনিয়র্স যে রত্ন চিনতে ভুল করেছিল, উডিনেস তা খুব সহজেই লুফে নেয়। ইতালিয়ান সিরি এ লিগ তার রক্ষণাত্মক কৌশল এবং কঠিন শারীরিক ফুটবলের জন্য পরিচিত। অনেকেই ভেবেছিলেন মোলিনা হয়তো ইতালিতে মানিয়ে নিতে পারবেন না। কিন্তু সবাইকে ভুল প্রমাণ করে তিনি নিজেকে আমূল বদলে ফেলেন।
উডিনেসের হয়ে সিরি এ-তে তার আক্রমণাত্মক মেজাজ এবং অসাধারণ গোল করার ক্ষমতা সবার নজর কাড়ে। ২০২১-২০২২ মৌসুমে একজন রাইট-ব্যাক হিসেবে তিনি লিগে ৭টি গোল করেন এবং বেশ কয়েকটি অ্যাসিস্ট করেন, যা ছিল ইউরোপের শীর্ষ ৫ লিগের যেকোনো ডিফেন্ডারের জন্য অন্যতম সেরা পরিসংখ্যান। তার এই অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স দেখে ইউরোপের বড় বড় ক্লাবগুলো তাকে দলে নিতে মরিয়া হয়ে ওঠে।
উডিনেসে দুই মৌসুম দুর্দান্ত কাটানোর পর ২০২২ সালের জুলাই মাসে স্প্যানিশ জায়ান্ট আতলেতিকো মাদ্রিদ প্রায় ২০ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে নাহুয়েল মোলিনাকে দলে ভেড়ায়। আতলেতিকোর আর্জেন্টাইন কোচ ডিয়েগো সিমিওনে এমন একজন রাইট-ব্যাক খুঁজছিলেন যিনি রক্ষণে যেমন জমাট, আক্রমণেও ঠিক ততটাই ক্ষিপ্র। মোলিনা ছিলেন সেই নিখুঁত পাজল।
আতলেতিকো মাদ্রিদে যোগ দেওয়ার পর স্প্যানিশ লা লিগার সাথে মানিয়ে নিতে তার কিছুটা সময় লাগলেও, বিশ্বকাপের পর তিনি দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ে পরিণত হন। সিমিওনের অধীনে তিনি রক্ষণভাগকে আরও সুসংগঠিত করতে শিখেন। বর্তমানে ২০২৫-২০২৬ মৌসুমেও তিনি আতলেতিকো মাদ্রিদের রক্ষণভাগের অন্যতম প্রধান ভরসা এবং চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ও ঘরোয়া লিগে ধারাবাহিকভাবে পারফর্ম করে চলেছেন।

আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে নাহুয়েল মোলিনার অভিষেক হয় ২০২১ সালের জুনে, চিলির বিপক্ষে একটি বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচে। কোচ লিওনেল স্কালোনি তার ওপর অগাধ আস্থা রেখেছিলেন। জাতীয় দলে অভিষেকের পরপরই তিনি ২০২১ সালের কোপা আমেরিকা দলে ডাক পান। গঞ্জালো মন্তিয়েলের সাথে রাইট-ব্যাক পজিশন ভাগাভাগি করে খেললেও, তিনি প্রতিটি সুযোগেরই সদ্ব্যবহার করেন। দীর্ঘ ২৮ বছরের শিরোপা খরা কাটিয়ে আর্জেন্টিনার কোপা আমেরিকা জয়ে তার বড় ভূমিকা ছিল। ২০২২ সালে ইতালির বিপক্ষে ‘ফিনালিসিমা’ জয়ের ম্যাচেও তিনি দুর্দান্ত পারফর্ম করেন।
নাহুয়েল মোলিনার ক্যারিয়ারের শ্রেষ্ঠ এবং অবিস্মরণীয় সময় আসে ২০২২ ফিফা বিশ্বকাপে। পুরো টুর্নামেন্টে তিনি রাইট উইং দিয়ে প্রতিপক্ষের জন্য এক আতঙ্কের নাম হয়ে ওঠেন। কোয়ার্টার ফাইনালে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে তার করা গোলটি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সুন্দর দলীয় গোল হিসেবে বিবেচিত। লিওনেল মেসির সেই অবিশ্বাস্য ‘নো-লুক’ পাস এবং ডি-বক্সের ভেতর মোলিনার বিদ্যুৎগতির দৌড় ও নিখুঁত ফিনিশিং ভক্তদের মনে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। এটি ছিল জাতীয় দলের হয়ে তার প্রথম গোল।

ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে কিলিয়ান এমবাপের মতো দ্রুতগতির এবং ভয়ংকর খেলোয়াড়কে রুখে দেওয়ার কঠিন দায়িত্বটিও তিনি সাহসের সাথে পালন করেছেন। অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত মাঠে থেকে তিনি আর্জেন্টিনার ৩৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটাতে সাহায্য করেন।
২০২৪ সালের কোপা আমেরিকাতেও মোলিনা আর্জেন্টিনার শিরোপা জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বর্তমানে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে তিনি দলের নিয়মিত মুখ। গঞ্জালো মন্তিয়েলের সাথে তার এক স্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা রয়েছে, যা দলের রক্ষণের গভীরতাকে আরও মজবুত করেছে।
নাহুয়েল মোলিনা মাঠের মতো ব্যক্তিগত জীবনেও খুব গোছানো এবং শান্ত প্রকৃতির একজন মানুষ। তার বাবার নাম হুগো মোলিনা এবং মায়ের নাম লেলিয়া লুসেরো। একটি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা মোলিনার ফুটবলার হওয়ার পেছনে তার পরিবারের বিশাল অবদান রয়েছে। বিশেষ করে তার বাবা তাকে সবসময় উৎসাহ দিয়েছেন। ছোটবেলায় যখন তিনি স্থানীয় ক্লাবে খেলতেন, তখন তার পরিবার সবসময় মাঠের পাশে উপস্থিত থাকত। বিশ্বকাপ জয়ের পর মোলিনা তার পদক এবং সাফল্য তার পরিবারকেই উৎসর্গ করেছিলেন।
নাহুয়েল মোলিনার দীর্ঘদিনের প্রেমিকার নাম বারবারা ইগলেসিয়াস। তারা একে অপরের সাথে বেশ কয়েক বছর ধরে সম্পর্কে আবদ্ধ। মোলিনার ক্যারিয়ারের কঠিন সময়গুলোতে বারবারা সবসময় তার পাশে ছিলেন। বোকা জুনিয়র্স ছেড়ে মোলিনা যখন ইতালিতে এবং পরে স্পেনে পাড়ি জমান, তখন বারবারাও তার সাথে ইউরোপে চলে যান।

২০২২ কাতার বিশ্বকাপ এবং কোপা আমেরিকার ম্যাচগুলোতে বারবারাকে গ্যালারিতে আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে মোলিনাকে সমর্থন করতে দেখা গেছে। বিশ্বকাপ জয়ের পর মাঠে নেমে তারা একসাথে সোনালী ট্রফি নিয়ে উদযাপনও করেছিলেন।
নাহুয়েল মোলিনা এবং বারবারা ইগলেসিয়াস দীর্ঘ সময় ধরে ইউরোপে একসাথে বসবাস করলেও, তারা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হননি। ফুটবল মাঠের তারকা হলেও ব্যক্তিগত জীবনে তারা দুজনেই খুব সাধারণ এবং গ্ল্যামার-বিমুখ জীবনযাপন করতে পছন্দ করেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় তারা খুব বেশি সরব না থাকলেও, মাঝে মাঝে নিজেদের ছুটির দিন বা সুন্দর মুহূর্তের ছবি ভক্তদের সাথে শেয়ার করেন।
Reference:

