জাপানের ওসাকা শহরে অবস্থিত শিতেননোজি মন্দিরটি জাপানের অন্যতম প্রাচীন এবং ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি বৌদ্ধ মন্দির। জাপানের আধুনিকতা এবং গগনচুম্বী অট্টালিকার ভিড়ে এই মন্দিরটি যেন প্রাচীন জাপানি আধ্যাত্মিকতা এবং প্রশান্তির এক অনন্য প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রতি বছর লাখ লাখ দেশি-বিদেশি পর্যটক ও তীর্থযাত্রী এই প্রাচীন উপাসনালয়টির সৌন্দর্য এবং ঐতিহাসিক গুরুত্ব উপলব্ধি করতে এখানে ছুটে আসেন।

৫৯৩ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত শিতেননোজি মন্দিরকে জাপানের সর্বপ্রথম রাষ্ট্রীয়ভাবে পরিচালিত এবং আনুষ্ঠানিকভাবে নির্মিত বৌদ্ধ মন্দির হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
এই মন্দিরটি নির্মাণের পেছনে প্রধান কারিগর ছিলেন জাপানের ইতিহাসে অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব প্রিন্স শোতোকু। ষোড়শ শতাব্দীতে যখন জাপানে বৌদ্ধ ধর্মের প্রসার কেবল শুরু হচ্ছে, তখন তিনি এই ধর্মকে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করেন। প্রাচীন জাপানি গোত্রগুলোর মধ্যে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ নিয়ে তীব্র বিরোধ শুরু হলে, প্রিন্স শোতোকু এই মন্দির নির্মাণের মানত করেছিলেন যাতে তিনি যুদ্ধে জয়লাভ করতে পারেন।

প্রিন্স শোতোকুকে “জাপানি বৌদ্ধ ধর্মের জনক” বলা হয়, এবং তার অবিস্মরণীয় অবদানের কারণে তার ছবি একসময় জাপানের ১০,০০০ ইয়েনের ব্যাংকনোটের ওপর মুদ্রিত ছিল।
‘শিতেননোজি’ নামের একটি গভীর অর্থ রয়েছে। জাপানি ভাষায় ‘শিতেননো’ বলতে বোঝায় চারজন স্বর্গীয় রাজাকে। বৌদ্ধ ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ী, এই চারজন রাজা মহাবিশ্বের চারটি দিক (উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিম) রক্ষা করেন এবং পৃথিবীকে অশুভ শক্তির হাত থেকে বাঁচান। যুদ্ধে জয়ী হওয়ার পর প্রিন্স শোতোকু এই চার রাজার প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বরূপ বিশাল এই মন্দিরটি নির্মাণ করে তাদের উৎসর্গ করেন।
মন্দিরের প্রধান প্রবেশদ্বারের কাছে কাঠের তৈরি এই চারজন স্বর্গীয় রাজার ভয়ংকর কিন্তু আকর্ষণীয় বিশাল মূর্তি রয়েছে, যা মন্দিরকে অশুভ আত্মাদের হাত থেকে রক্ষা করার প্রতীক হিসেবে কাজ করে।

শিতেননোজি মন্দিরের স্থাপত্যশৈলী জাপানের মন্দির নির্মাণের ইতিহাসে একটি বড় মাইলফলক। এর মূল কাঠামোগত বিন্যাসকে বলা হয় “শিতেননোজি-স্টাইল গারাং”। এই নির্দিষ্ট বিন্যাসে মন্দিরের মূল তোরণ, প্যাগোডা, প্রধান হল, এবং লেকচার হল একেবারে দক্ষিণ থেকে উত্তর দিকে একটি নিখুঁত সরল রেখায় অবস্থান করে। এই শৈলীটি সরাসরি ৬ষ্ঠ শতাব্দীর চীন এবং কোরিয়ার স্থাপত্য থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে জাপানে নিয়ে আসা হয়েছিল।
এই “গারাং” বিন্যাসটি জাপানের সবচেয়ে পুরনো স্থাপত্য নকশাগুলোর একটি, যা ভূমিকম্প ও যুদ্ধবিগ্রহ সত্ত্বেও গত ১৪০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
মন্দিরের ভেতরের প্রাঙ্গণে প্রবেশ করলেই চোখে পড়বে একটি দৃষ্টিনন্দন পাঁচতলা প্যাগোডা। দূর থেকেই এর রাজকীয় উচ্চতা এবং ছাদের সুন্দর কারুকাজ দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। প্যাগোডার ভেতরে গৌতম বুদ্ধের পবিত্র দেহাংশ বা ধ্বংসাবশেষ সংরক্ষিত আছে বলে বিশ্বাস করা হয়। বাইরের সৌন্দর্যের পাশাপাশি প্যাগোডাটির ভেতরের আধ্যাত্মিক পরিবেশও অত্যন্ত শান্তিময় এবং গম্ভীর।
জাপানের বেশিরভাগ প্রাচীন মন্দিরের প্যাগোডায় দর্শনার্থীদের প্রবেশের অনুমতি না থাকলেও, শিতেননোজির এই পাঁচতলা প্যাগোডার ভেতরে সাধারণ মানুষ প্রবেশ করতে পারেন এবং কাঠের তৈরি সরু সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে পারেন।
প্যাগোডার ঠিক পাশেই রয়েছে ‘কন্দো’ বা গোল্ডেন প্যাভিলিয়ন, যা মন্দিরের প্রধান উপাসনালয়। এখানে মূলত গৌতম বুদ্ধ এবং বোধিসত্ত্বের মূর্তি স্থাপন করা আছে, যেখানে পূজারিরা তাদের মূল প্রার্থনা সম্পন্ন করে থাকেন। হলের ভেতরের দেয়ালগুলোতে গৌতম বুদ্ধের জীবনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা অত্যন্ত চমৎকার এবং নিখুঁত চিত্রকর্মের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যা পর্যটকদের মনোযোগ আকর্ষণ করে।

কন্দো হলের ভেতরে স্থাপিত মূল মূর্তির নাম হলো ‘নিয়োরাই কানন’, যাকে বৌদ্ধ ধর্মে অনন্ত করুণা এবং দয়ার প্রতীক হিসেবে পূজা করা হয়।
শিতেননোজি মন্দিরের ইতিহাস যেমন গৌরবময়, তেমনি ধ্বংস ও পুনর্নির্মাণের এক দীর্ঘ সংগ্রামেও ভরপুর। গত ১৪০০ বছরে মন্দিরটি অসংখ্যবার প্রাকৃতিক দুর্যোগ, প্রলয়ংকরী অগ্নিকাণ্ড এবং গৃহযুদ্ধের কারণে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন বিমান হামলায় এটি প্রায় সম্পূর্ণ পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু জাপানিরা প্রতিবারই অত্যন্ত যত্ন ও নিখুঁত পরিকল্পনার মাধ্যমে মন্দিরটিকে এর ৬ষ্ঠ শতাব্দীর মূল নকশা অনুযায়ী পুনর্নির্মাণ করেছে।

বর্তমানে আমরা যে মন্দিরটি দেখতে পাই তা ১৯৬৩ সালে সর্বশেষ পুনর্নির্মাণ করা হয়। যদিও এটি দেখতে প্রাচীন কাঠের তৈরি মনে হয়, কিন্তু স্থায়িত্ব বাড়ানোর জন্য আধুনিক এই পুনর্নির্মাণে স্টিল ও কংক্রিট ব্যবহার করা হয়েছে।
মন্দিরের বিশাল কমপ্লেক্সের ভেতরে রয়েছে অত্যন্ত সুন্দর এবং শান্তিময় একটি ঐতিহ্যবাহী জাপানি বাগান, যার নাম গোকুরাকু-জোদো বা প্যারাডাইস গার্ডেন। এই বাগানটি মূলত বৌদ্ধ ধর্মের ‘ওয়েস্টার্ন প্যারাডাইস’ বা পরকালের স্বর্গীয় শান্তির ধারণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। এখানে রয়েছে ছোট ছোট পাহাড়ি ঢিবি, শান্ত জলের পুকুর, নান্দনিক পাথরের সেতু এবং জাপানি চেরি ও পাম গাছ।

বসন্তকালে যখন চেরি ফুল ফোটে, তখন এই গোকুরাকু-জোদো বাগানের সৌন্দর্য এমন এক স্বর্গীয় রূপ ধারণ করে যে মনে হয় যেন দর্শনার্থীরা রূপকথার কোনো জাদুকরী রাজ্যে এসে পড়েছেন।
শিতেননোজি মন্দিরের একটি অনন্য ও জনপ্রিয় আকর্ষণ হলো এর ‘কামে-নো-ইকে’ বা কচ্ছপের পুকুর। পাথরের তৈরি একটি বেদির চারপাশে ঘেরা এই পুকুরে শত শত কচ্ছপ রোদ পোহাতে দেখা যায়। দর্শনার্থীরা প্রায়ই পুকুরের পাড়ে দাঁড়িয়ে কচ্ছপদের সাঁতার কাটা এবং পাথরের ওপর উঠে বিশ্রাম নেওয়ার দৃশ্য উপভোগ করেন, যা পুরো গম্ভীর পরিবেশকে কিছুটা হালকা ও জীবন্ত করে তোলে।
বৌদ্ধ ধর্মে কচ্ছপকে দীর্ঘায়ু, প্রজ্ঞা এবং সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। ভক্তরা পুণ্য লাভের আশায় যুগ যুগ ধরে এই পুকুরে কচ্ছপ অবমুক্ত করে আসছেন, যার ফলে এখানে কচ্ছপের সংখ্যা এত বিশাল।
ইতিহাস ও শিল্পপ্রেমীদের জন্য শিতেননোজি মন্দিরের ‘ট্রেজার হাউস’ একটি গুপ্তধনের মতো। এখানে প্রিন্স শোতোকুর ব্যবহৃত ব্যক্তিগত জিনিসপত্র, প্রাচীন পেইন্টিং, ক্যালিগ্রাফি এবং বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থসহ অসংখ্য অমূল্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সংরক্ষিত আছে। এর মধ্যে অনেকগুলো জিনিসকে জাপান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ‘জাতীয় সম্পদ’ এবং ‘গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক সম্পত্তি’ হিসেবে ঘোষণা করেছে।
এই ট্রেজার হাউসের ভেতরে প্রিন্স শোতোকুর নিজস্ব তলোয়ার অত্যন্ত সযত্নে সংরক্ষিত আছে, যা সপ্তম শতাব্দীর শুরুর দিকের অন্যতম সেরা অস্ত্র তৈরির নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হয়।
শুধুমাত্র ধর্মীয় কারণেই নয়, শিতেননোজি মন্দির সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের সাথেও গভীরভাবে যুক্ত। প্রতি মাসের ২১ ও ২২ তারিখে মন্দিরের বাইরের প্রাঙ্গণে একটি বিশাল ফ্লি মার্কেট বা খোলা বাজার বসে। এই বাজারে অ্যান্টিক জিনিসপত্র, পুরোনো কিমোনো পোশাক, জাপানি মৃৎশিল্প থেকে শুরু করে সুস্বাদু স্ট্রিট ফুড সবকিছুই খুব সস্তায় পাওয়া যায়, যা স্থানীয়দের পাশাপাশি পর্যটকদেরও দারুণভাবে আকর্ষণ করে।
এই দুই দিনের বাজারকে স্থানীয়রা “দাইশি-এ” এবং “তাইশি-এ” বলে ডাকেন, যা মূলত প্রিন্স শোতোকু এবং জাপানের বিখ্যাত বৌদ্ধ সন্ন্যাসী কোবো দাইশির মৃত্যুবার্ষিকী স্মরণে আয়োজন করা হয়।

শিতেননোজি মন্দিরের একটি অদ্ভুত এবং কৌতূহলোদ্দীপক বৈশিষ্ট্য হলো এর মূল প্রবেশপথে অবস্থিত বিশাল একটি পাথরের তোরণ বা ‘তোরি গেইট’ । সাধারণত জাপানে তোরি গেইট দেখা যায় শিন্তো উপাসনালয়গুলোতে, আর বৌদ্ধ মন্দিরগুলোর তোরণ সাধারণত কাঠের তৈরি হয়। কিন্তু শিতেননোজিতে এই তোরি গেইটের উপস্থিতি দুই ভিন্ন ধর্মের এক অপূর্ব মেলবন্ধনের প্রমাণ দেয়।
শিতেননোজির এই পাথরের তোরি গেইটটি ১২৯৪ সালে তৈরি করা হয়েছিল এবং এটি সমগ্র জাপানের সবচেয়ে প্রাচীন পাথরের তোরি গেইটগুলোর মধ্যে একটি।

প্রিন্স শোতোকু শুধু মন্দিরই নির্মাণ করেননি, বরং সাধারণ মানুষের সেবায় তিনি শিতেননোজি কমপ্লেক্সে চারটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন, যা একত্রে ‘শিকা-ইন’ নামে পরিচিত। এর মধ্যে ছিল ধর্মীয় শিক্ষার প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসালয়, ফার্মাসি এবং অসহায়দের জন্য বৃদ্ধাশ্রম । ১৪০০ বছর আগে সমাজে এমন জনকল্যাণমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সত্যিই অভাবনীয় ছিল।
শিতেননোজির ভেতরে প্রতিষ্ঠিত এই দাতব্য চিকিৎসালয় এবং ফার্মাসিকেই জাপানের ইতিহাসের সর্বপ্রথম প্রাতিষ্ঠানিক হাসপাতাল এবং ঔষধালয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এই মন্দিরের সংস্কৃতি কতটা প্রাণবন্ত তা বোঝা যায় এর বিভিন্ন বাৎসরিক উৎসবের দিকে তাকালে। প্রতি বছর জানুয়ারি মাসে এখানে ‘দোয়া দোয়া’ নামে একটি ব্যতিক্রমী উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। তীব্র শীতের মধ্যে তরুণরা শুধুমাত্র একটি ঐতিহ্যবাহী লেংটি পরে মন্দিরের প্রাঙ্গণে জড়ো হয় এবং ছাদ থেকে ফেলা পবিত্র তাবিজ ধরার জন্য তীব্র প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। এটি দেখতে প্রচুর মানুষের সমাগম ঘটে।

এই উৎসবে অংশগ্রহণকারী তরুণদের গায়ে ঠাণ্ডা পানি ছিটিয়ে দেওয়া হয়, এবং বিশ্বাস করা হয় যে যে ব্যক্তি ওই পবিত্র তাবিজটি ধরতে পারবেন, তার সারা বছর সৌভাগ্য, সুস্বাস্থ্য ও সমৃদ্ধি বজায় থাকবে।
ভেতরের মূল উপাসনালয়গুলোতে প্রবেশের জন্য নির্দিষ্ট সময় বা টিকিট লাগলেও, শিতেননোজি মন্দিরের বাইরের বিশাল প্রাঙ্গণ ২৪ ঘণ্টাই সাধারণ মানুষের জন্য খোলা থাকে, ফলে রাতেও এখানে এসে মানুষ একাকী প্রশান্তি উপভোগ করতে পারেন।
Reference:
- https://en.wikipedia.org/wiki/Shitenn%C5%8D-ji
- https://www.japan-guide.com/e/e4011.html
- https://www.jeepe.jp/en/articles/osaka-shitennoji-temple-1204
- https://www.japan-experience.com/all-about-japan/osaka/temples-and-shrines-in-japan/shitennoji-temple-tennoji-osaka
- https://www.tripadvisor.com/Attraction_Review-g298566-d321316-Reviews-Shitennoji-Osaka_Osaka_Prefecture_Kinki.html

