৪ বছর বয়সে ইউটিউবে গোলপোস্ট কাঁপানোর ভিডিও আপলোড করে প্যালমেইরাসের নজর কেড়েছিলেন এনড্রিক! যেখানে আমাদের ৪ বছর বয়সে প্রধান কাজ ছিল প্যান্টে হিসু করা আর মাটি খাওয়া, সেখানে এই ছেলে রিয়াল মাদ্রিদের টিকিট বুক করে বসে ছিল!
ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর মেন্টালিটি আর রোনালদো নাজারিওর ক্ষিপ্রতা নিয়ে বিশ্ব ফুটবল শাসন করতে আসা ব্রাজিলের নতুন বিস্ময় এনড্রিক ফিলিপ! ব্রাজিলের প্যালমেইরাস থেকে সান্তিয়াগো বার্নাব্যুর রাজকীয় মঞ্চ খুব অল্প সময়েই বিশ্ব ফুটবলকে নিজের জাদুতে বুদ করে রেখেছেন এই তরুণ স্ট্রাইকার।
এন্ড্রিক- এর ব্যক্তিগত তথ্য:
|
নাম |
এনড্রিক ফিলিপ মরেইরা দে সুসা |
|
ডাকনাম |
এনড্রিক |
|
জন্ম |
২১ জুলাই ২০০৬ (বয়স ১৯) |
|
জন্মস্থান |
তাগুয়াতিনগা, ফেডারেল জেলা , ব্রাজিল |
|
উচ্চতা |
১.৭৩ মিটার (৫ ফুট ৮ ইঞ্চি) |
|
পজিশন |
স্ট্রাইকার |
|
ক্লাব ক্যারিয়ার |
পালমেইরাস,রিয়াল মাদ্রিদ এবং বর্তমানে লিওঁ ক্লাবের হয়ে খেলেছেন। |
|
আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার |
২০২৩– ব্রাজিল |

এনড্রিক ফিলিপ মরেইরা দে সুসার জন্ম ২০০৬ সালের ২১ জুলাই, ব্রাজিলের ব্রাসিলিয়াতে। অনেক ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তির মতোই তার শৈশবটাও কেটেছে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে। তার বাবা ডগলাস সুসাও একজন ফুটবলার হতে চেয়েছিলেন, কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে তিনি সফল হতে পারেননি। ফলে নিজের অধরা স্বপ্ন তিনি ছেলের চোখের মধ্যে দেখতে পান।
এনড্রিকের বয়স যখন মাত্র চার বছর, তখন থেকেই তার বাবা তার ফুটবল খেলার ভিডিও ইউটিউবে আপলোড করতে শুরু করেন, যাতে ব্রাজিলের বড় বড় ক্লাবগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায়। এনড্রিকের পরিবারে এমনও দিন গেছে যখন তাদের ঘরে পর্যাপ্ত খাবার ছিল না। মাত্র ১০ বছর বয়সে এনড্রিক তার বাবাকে কাঁদতে দেখে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, “তুমি কেঁদো না বাবা, আমি একজন পেশাদার ফুটবলার হব এবং আমাদের এই অবস্থা থেকে মুক্তি দেব।”

এই প্রতিজ্ঞাই তাকে তাড়া করে বেরিয়েছে। ব্রাজিলের অন্যতম শীর্ষ ক্লাব প্যালমেইরাস তার প্রতিভা বুঝতে পারে এবং তার পরিবারকে ব্রাসিলিয়া থেকে সাও পাওলোতে নিয়ে আসে। ক্লাবটি এনড্রিকের বাবার জন্য ক্লাবেই একটি পরিচ্ছন্নতাকর্মীর চাকরির ব্যবস্থা করে, যাতে পরিবারটি টিকে থাকতে পারে।
প্যালমেইরাসের যুব একাডেমিতে যোগ দেওয়ার পর এনড্রিক যা করেছিলেন, তা এক কথায় অবিশ্বাস্য। মাত্র ৫ বছরে ক্লাবের বিভিন্ন বয়সভিত্তিক দলের হয়ে তিনি ১৬৯ ম্যাচে ১৬৫টি গোল করেন।
প্রতিটি ম্যাচেই তিনি তার চেয়ে ৩-৪ বছরের বড় খেলোয়াড়দের বিপক্ষে খেলতেন, কিন্তু শারীরিক শক্তি এবং ট্যাকটিকাল বুদ্ধিমত্তায় তিনি সবাইকে ছাড়িয়ে যেতেন। ২০২২ সালে ব্রাজিলের মর্যাদাপূর্ণ যুব টুর্নামেন্ট কোপিনহাতে তিনি ৭ ম্যাচে ৬ গোল করে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন। এই টুর্নামেন্টের পরেই বিশ্ব মিডিয়া এনড্রিককে নিয়ে মেতে ওঠে।

২০২২ সালের অক্টোবর মাসে, মাত্র ১৬ বছর ২ মাস ১৬ দিন বয়সে প্যালমেইরাসের সিনিয়র দলের হয়ে এনড্রিকের অভিষেক হয়। এর মাধ্যমে তিনি ক্লাবের ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নামার রেকর্ড গড়েন।
২০২৩ মৌসুমটি ছিল এনড্রিকের জন্য নিজেকে চেনার বছর। লিগের শেষভাগে এসে প্যালমেইরাস যখন শিরোপা দৌড়ে পিছিয়ে পড়ছিল, তখন এনড্রিকের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দলকে লিগ শিরোপা জেতাতে সাহায্য করে। ২০২৩ মৌসুমে তিনি লিগে ১১টি গোল করেন, যা নেইমারের পর কোনো অনূর্ধ্ব-১৭ খেলোয়াড়ের সর্বোচ্চ গোল।

বর্তমান ফুটবল বিশ্বে কোনো ব্রাজিলিয়ান তরুণ প্রতিভা আলো ছড়ালে রিয়াল মাদ্রিদের প্রধান স্কাউট জুনি কালাফাততা মিস করবেন না এটাই স্বাভাবিক। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র এবং রদ্রিগোর সাফল্যের পর রিয়াল মাদ্রিদ এনড্রিকের ওপর নজর রাখছিল।
২০২২ সালের ডিসেম্বরে, যখন এনড্রিকের বয়স মাত্র ১৬ বছর, তখন রিয়াল মাদ্রিদ প্যালমেইরাসের সাথে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। ফিফার নিয়ম অনুযায়ী ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে কোনো অ-ইউরোপীয় খেলোয়াড় ইউরোপের ক্লাবে যোগ দিতে পারেন না। তাই চুক্তি হলেও এনড্রিককে ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত ব্রাজিলেই থাকতে হয়েছিল।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার পর এনড্রিক আনুষ্ঠানিকভাবে সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে রিয়াল মাদ্রিদের খেলোয়াড় হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তার পরিচিতি পর্বে স্টেডিয়ামে হাজার হাজার দর্শক উপস্থিত হয়েছিল, যা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর আগমনের কথা মনে করিয়ে দেয়। রিয়ালে এসেও তিনি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ও লা লিগায় অভিষেক ম্যাচেই গোল করে নিজের আগমনী বার্তা দিয়ে রেখেছেন।

ঘরোয়া ফুটবলে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পুরস্কার হিসেবে ২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে এনড্রিক ব্রাজিলের মূল জাতীয় দলে ডাক পান। কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচ দিয়ে মাত্র ১৭ বছর ১১৮ দিন বয়সে তার আন্তর্জাতিক অভিষেক হয়। তিনি ব্রাজিলের ইতিহাসে চতুর্থ সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে অভিষেক করেন ।
২০২৪ সালের মার্চ মাসে ইংল্যান্ডের ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে প্রীতি ম্যাচে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে গোল করে ব্রাজিলকে ১-০ ব্যবধানে জেতান। এর মাধ্যমে তিনি ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ আন্তর্জাতিক গোলদাতা হন। এর ঠিক তিন দিন পর স্পেনের বিরুদ্ধে সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতেও তিনি গোল করেন।

২০২৬ বিশ্বকাপ স্কোয়াডে এনড্রিকের অন্তর্ভুক্তি কেবল ব্রাজিলের জন্য নয়, পুরো ফুটবল বিশ্বের জন্যই অন্যতম বড় একটি আকর্ষণ। মাত্র ১৯ বছর বয়সে সেলেসাওদের বিশ্বকাপ দলে জায়গা করে নিয়ে এই তরুণ স্ট্রাইকার ইতিমধ্যেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন। নেইমার-ভিনিসিয়ুসদের পাশে থেকে নিজেকে একজন গ্লোবাল সুপারস্টার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার এটাই এনড্রিকের জন্য সোনালী সুযোগ। ব্রাজিলের হেক্সা জয়ের মিশনে এই তরুণ তুর্কি ট্রাম্প কার্ড হয়ে উঠতে পারেন।
Reference:

