Image default
ক্রীড়াবিদজীবনীফুটবল

৬ বিশ্বকাপের কিংবদন্তি গুইলার্মো ওচোয়া

বিশ্বকাপের সময় গুইলার্মো ওচোয়াকে নিয়ে ইন্টারনেটে একটি দারুণ মিম প্রচলিত আছে। ভক্তরা মজা করে বলেন ওচোয়া আসলে কোনো ফুটবলার নন, তিনি একজন সরকারি চাকুরিজীবী! ৪ বছর পর পর শুধু বিশ্বকাপের সময় অফিস থেকে ছুটি নিয়ে খেলতে আসেন এবং খেলা শেষ হতেই আবার অদৃশ্য হয়ে যান। 

মেক্সিকোর কিংবদন্তি গোলরক্ষক ফ্রান্সিসকো গুইলার্মো ওচোয়া মাগানিয়া যিনি “মেমো ওচোয়া” নামে পরিচিত। তার কোঁকড়ানো চুল, মাথায় ব্যান্ড এবং গোলপোস্টের নিচে অবিশ্বাস্য রিফ্লেক্স তাকে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম চেনা ও জনপ্রিয় মুখ করে তুলেছে। ১৯৮৫ সালের ১৩ জুলাই মেক্সিকোর গুয়াদালাহারায় জন্ম নেওয়া এই গোলরক্ষক মেক্সিকান ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং বিশ্ব কাপের ইতিহাসের অন্যতম সফল গোলরক্ষক হিসেবে নিজের নাম লিখিয়েছেন।

গুইলার্মো ওচোয়া- এর ব্যক্তিগত তথ্য:

নাম

ফ্রান্সিসকো গুইলার্মো ওচোয়া মাগানিয়া

জন্ম

১৩ জুলাই ১৯৮৫ (বয়স ৪০)

জন্মস্থান

গুয়াদালাহারা , মেক্সিকো

উচ্চতা

১.৮৫ মিটার (৬ ফুট ১ ইঞ্চি)

পজিশন

গোলরক্ষক

ক্লাব ক্যারিয়ার

টিগ্রিলোস কোয়াপা,সান লুইস,আজাসিও,মালাগা,গ্রানাডা,স্ট্যান্ডার্ড লিয়েজ,আমেরিকা,স্যালারনিটানা,এভিএস এবং বর্তমানে এএল লিমাসোল ক্লাবের হয়ে খেলছেন।

আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার

২০০৫– মেক্সিকো

গুইলার্মো ওচোয়া – Image Source:e0.365dm.com

গুইলার্মো ওচোয়ার ফুটবল যাত্রা শুরু হয় মেক্সিকোর সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং সফল ক্লাব ক্লাব আমেরিকার যুব একাডেমির মাধ্যমে। ২০০৪ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে ক্লাব আমেরিকার মূল দলে অভিষেক হয়। তৎকালীন প্রথম পছন্দের গোলরক্ষক আদোলফো রিওসের ইনজুরির কারণে ওচোয়া সুযোগ পান এবং প্রথম ম্যাচ থেকেই নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন।

২০০৫ সালে মাত্র ২০ বছর বয়সে তিনি ক্লাব আমেরিকার হয়ে তার প্রথম ‘ক্লসুরা’ চ্যাম্পিয়নশিপ জেতেন। ক্লাব আমেরিকার হয়ে গুইলার্মো ওচোয়া টানা সাত বছর খেলেন এবং ২০০টিরও বেশি ম্যাচে মাঠে নামেন। এই সময়ে তিনি মেক্সিকান লিগের সেরা তরুণ খেলোয়াড় এবং পরবর্তীতে সেরা গোলরক্ষকের পুরষ্কার অর্জন করেন। তার এই দুর্দান্ত পারফরম্যান্স ইউরোপীয় ক্লাবগুলোর নজর কাড়ে।

মেক্সিকান লিগের সেরা তরুণ খেলোয়াড় – Image Source:a.espncdn.com

২০১১ সালে গুইলার্মো ওচোয়া মেক্সিকো ছেড়ে ফরাসি ক্লাব আজাসিওতে যোগ দেন। আজাসিও তখন রেলিগেশন এড়ানোর লড়াইয়ে ব্যস্ত ছিল। তবে ওচোয়া ফরাসি লিগ ওয়ানে নিজেকে প্রমাণ করতে বেশি সময় নেননি। তিন মৌসুমে তিনি আজাসিওর হয়ে ১১২টি ম্যাচ খেলেন এবং শত শত অবিশ্বাস্য সেভ করে ক্লাবটিকে লিগ ওয়ানে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করেন। বিশেষ করে ২০১৩ সালে পিএসজির বিপক্ষে জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ ও কাভানিদের একের পর এক শট আটকে দিয়ে ম্যাচটি ১-১ ড্র করেছিলেন, যা লিগ ওয়ানের ইতিহাসে অন্যতম সেরা গোলকিপিং পারফরম্যান্স হিসেবে গণ্য করা হয়।

আজাসিওর পর গুইলার্মো ওচোয়া স্প্যানিশ লা লিগার ক্লাব মালাগা এবং গ্রানাদাতে খেলেন। মালাগায় তাকে মূলত সাইডবেঞ্চে কাটাতে হলেও, গ্রানাদার হয়ে ২০১৬-১৭ মৌসুমে তিনি এক মৌসুমে লিগে সবচেয়ে বেশি সেভ করার রেকর্ড গড়েন, যদিও দুর্বল ডিফেন্সের কারণে গ্রানাদাকে রেলিগেশন থেকে বাঁচাতে পারেননি। এরপর তিনি বেলজিয়ামের ক্লাব স্ট্যান্ডার্ড লিজে যোগ দেন এবং সেখানে বেলজিয়াম কাপ জেতেন।

বেলজিয়ামের ক্লাব স্ট্যান্ডার্ড লিজে গুইলার্মো ওচোয়া – Image Source:a2.espncdn.com

২০১৯ সালে গুইলার্মো ওচোয়া তার প্রিয় ক্লাব আমেরিকাতে ফিরে আসেন এবং আবারও মেক্সিকান লিগে নিজের আধিপত্য দেখান। ২০২৩ সালের শুরুতে ৩৭ বছর বয়সে তিনি আবারও ইউরোপে পাড়ি জমান এবং ইতালিয়ান সিরি এ ক্লাব সালের্নিতানাতে যোগ দিয়ে সেখানেও দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের মাধ্যমে ক্লাবটিকে রেলিগেশন থেকে রক্ষা করেন।

ক্লাব ফুটবলে গুইলার্মো ওচোয়ার ক্যারিয়ার গ্রাফ কিছুটা ওঠানামা করলেও, মেক্সিকোর জার্সিতে বিশ্বকাপে ওচোয়া মানেই এক অভেদ্য দেয়াল। ২০০৬ এবং ২০১০ বিশ্বকাপে তিনি স্কোয়াডে থাকলেও ব্যাক-আপ গোলরক্ষক হিসেবে বেঞ্চে ছিলেন। কিন্তু ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২২ বিশ্বকাপে ওচোয়া যা করেছেন, তা ফুটবল ইতিহাস চিরকাল মনে রাখবে।

মেক্সিকোর জার্সিতে বিশ্বকাপে ওচোয়া – Image Source:static.majalla.com

২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপ ছিল গুইলার্মো ওচোয়ার বিশ্বমঞ্চে নিজেকে চেনানোর আসল টুর্নামেন্ট। গ্রুপ পর্বে আয়োজক দেশ ব্রাজিলের বিপক্ষে ম্যাচটি ওচোয়ার ক্যারিয়ারের সেরা ম্যাচ হিসেবে বিবেচিত হয়। নেইমার, থিয়াগো সিলভা এবং অস্কারদের অন্তত ৬টি নিশ্চিত গোলের শট অবিশ্বাস্যভাবে রুখে দেন ওচোয়া। বিশেষ করে নেইমারের একটি জোরালো হেড যেভাবে তিনি গোললাইন থেকে ডাইভ দিয়ে ফিরিয়েছিলেন, তা ১৯৭০ বিশ্বকাপে পেলের শট আটকানো গর্ডন ব্যাঙ্কসের “শতাব্দীর সেরা সেভ”-এর কথা মনে করিয়ে দেয়। ম্যাচটি ০-০ গোলে ড্র হয় এবং ওচোয়া ‘ম্যান অব দ্য ম্যাচ’ নির্বাচিত হন। রাউন্ড অফ ১৬-এ নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষেও তিনি দুর্দান্ত খেলেন, যদিও শেষ মুহূর্তের দুই গোলে মেক্সিকো বিদায় নেয়।

২০১৮ বিশ্বকাপে মেক্সিকোর প্রথম ম্যাচই ছিল ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন জার্মানির বিপক্ষে। মস্কোর লুঝনিকি স্টেডিয়ামে গুইলার্মো ওচোয়া জার্মানির একের পর এক আক্রমণ নসাৎ করে দেন। টোনি ক্রুসের একটি ফ্রি-কিক যেভাবে তিনি লাফিয়ে উঠে পোস্টের কোণা থেকে ফিরিয়ে দেন, তা ছিল দেখার মতো। মেক্সিকো ম্যাচটি ১-০ ব্যবধানে জিতে ফুটবল বিশ্বকে চমকে দেয়। পুরো টুর্নামেন্টে ওচোয়া মোট ২৫টি সেভ করেছিলেন, যা ছিল ওই বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।

২০১৮ বিশ্বকাপে গুইলার্মো ওচোয়া – Image Source:rollingstone.com

২০২২ বিশ্বকাপে পোল্যান্ডের বিপক্ষে মেক্সিকোর প্রথম ম্যাচে পোলিশ সুপারস্টার রবার্ট লেভানদোভস্কি  পেনাল্টি শট নেন। ওচোয়া অসাধারণ বুদ্ধিমত্তায় বাঁ-দিকে ডাইভ দিয়ে পেনাল্টি আটকে দেন এবং ম্যাচটি ০-০ ড্র হয়। ৩৭ বছর বয়সেও তার এই রিফ্লেক্স প্রমাণ করে যে বিশ্বকাপের মঞ্চে তিনি কতটা অনবদ্য।

গুইলার্মো ওচোয়া মেক্সিকোর হয়ে ১৫০টিরও বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন, যা তাকে মেক্সিকোর ইতিহাসের অন্যতম সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলা খেলোয়াড় বানিয়েছে।

মেক্সিকোর অন্যতম সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলা খেলোয়াড় – Image Source:media-stg.assettype.com

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ যৌথভাবে আয়োজন করছে মেক্সিকো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডা। ৪১ বছর বয়সের কাছাকাছি এসেও গুইলার্মো ওচোয়া মেক্সিকোর ২৬ সদস্যের বিশ্বকাপ স্কোয়াডে নিজের জায়গা ধরে রেখেছেন। এটি তার ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ, যা ফুটবল ইতিহাসের এক অনন্য এবং বিরল কীর্তি ওচোয়া প্রমাণ করেছেন যে, ইতিহাসের সেরা হতে গেলে সবসময় বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্লাবে খেলতে হয় না, দেশের জার্সিতে বুক চিতিয়ে লড়াই করাই কিংবদন্তি হওয়ার জন্য যথেষ্ট।

Reference:

Related posts

রবার্তো আবনদানজিয়েরি: আর্জেন্টিনার বিশ্বস্ত গোলরক্ষক

আশা রহমান

এনড্রিক: ইউটিউবের বিস্ময় বালক থেকে ফুটবল সুপারস্টার

আশা রহমান

আলেক্স সান্দ্রো: ইউরোপে ব্রাজিলের নীরব রাজা

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More