মাঠে গোল ঠেকাতে তিনি ছিলেন বাজপাখি, কিন্তু হাঁটার স্টাইলটা হাঁসের মতো ছিল বলেই বন্ধুরা ভালোবেসে নাম রেখে দিল ‘এল পাতো’ বা “হাঁস”!xa0
রবার্তো আবনদানজিয়েরি আর্জেন্টাইন ফুটবলের ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় ও বিশ্বস্ত গোলরক্ষক। যিনি তার ক্ষিপ্র রিফ্লেক্স, নিখুঁত টাইমিং এবং পেনাল্টি ঠেকানোর সহজাত দক্ষতার জন্য বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। ভক্তদের কাছে তিনি মূলত “এল পাতো” বা “হাঁস” নামে পরিচিত ছিলেন।xa0
রবার্তো আবনদানজিয়েরি- এর ব্যক্তিগত তথ্য:
| নামxa0 | রবার্তো কার্লোস আবোনদানজিয়েরি |
| ডাকনাম | এল পাতো ( হাঁস ) |
| জন্ম xa0 | ১৯ আগস্ট ১৯৭২ (বয়স ৫৩) |
| জন্মস্থানxa0 | তোড়া , আর্জেন্টিনা |
| উচ্চতাxa0 | ১.৮৬ মিটার (৬ ফুট ১ ইঞ্চি) |
| পজিশনxa0 | গোলরক্ষক |
| ক্লাব ক্যারিয়ার | রোজারিও সেন্ট্রাল,বোকা জুনিয়র্স ও গেটাফে এর হয়ে খেলেছেন।xa0 |
| আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার | ২০০৪–২০০৮ আর্জেন্টিনা |

১৯৭২ সালের ১৯ আগস্ট আর্জেন্টিনার সান্তা ফে প্রদেশের বুকিঙ্গো নামক এক ছোট শহরে জন্মগ্রহণ করেন রবার্তো আবনদানজিয়েরি। আর দশটা আর্জেন্টাইন ছেলের মতো শৈশব থেকেই ফুটবলের প্রতি তার ছিল তীব্র টান। তবে অন্য স্ট্রাইকার হওয়ার স্বপ্ন দেখলেও, তিনি বেছে নেন গোলপোস্টের নিচে দাঁড়ানোর কঠিন দায়িত্ব।
১৯৯৪ সালে আর্জেন্টিনার ঘরোয়া লিগের ক্লাব রোজারিও সেন্ট্রাল-এর হয়ে তার পেশাদার ফুটবল ক্যারিয়ার শুরু হয়। সেখানে তিনি প্রায় দুই বছর খেলেন এবং ৫৭টি ম্যাচে মাঠে নামেন। ১৯৯৫ সালে রোজারিও সেন্ট্রালের হয়ে ‘কোপা কনমেবল’ জয় করার মাধ্যমে তরুণ আবনদানজিয়েরি বড় ক্লাবগুলোর নজরে আসেন। তার প্রতিভা ও ক্ষিপ্রতা দেখে আর্জেন্টিনার অন্যতম সফল ও ঐতিহ্যবাহী ক্লাব বোকা জুনিয়র্স ১৯৯৭ সালে তাকে দলে ভেড়ায়।

বোকা জুনিয়র্সে আবনদানজিয়েরির শুরুটা সহজ ছিল না। সে সময় বোকার এক নম্বর গোলরক্ষক ছিলেন কলম্বিয়ার কিংবদন্তি অস্কার করডোবা। ফলে দীর্ঘ চার বছর আবনদানজিয়েরি নিজেকে প্রমাণ করার তেমন সুযোগ পাননি। মূলত ব্যাকআপ গোলকিপার হিসেবে তাকে ডাগআউটে বসেই কাটাতে হয়েছিল। কিন্তু তিনি ধৈর্য হারাননি। অনুশীলনে নিজেকে উজার করে দিয়ে অপেক্ষা করতে থাকেন সঠিক সুযোগের।
২০০১ সালের শেষভাগে অস্কার করডোবা ক্লাব ছাড়লে বোকা জুনিয়র্সের এক নম্বর গোলকিপারের জার্সিটি পান আবনদানজিয়েরি। এরপরের ইতিহাস কেবলই সাফল্যের। বোকার গোলপোস্টের নিচে তিনি হয়ে ওঠেন এক দুর্ভেদ্য প্রাচীর। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বোকা জুনিয়র্সের স্বর্ণযুগের অন্যতম প্রধান কারিগর ছিলেন তিনি।
বোকা জুনিয়র্সের হয়ে তিনি ঘরোয়া এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অসংখ্য ট্রফি জিতেন। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল ২০০৩ সালের ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ। জাপানের ইয়োকোহামায় অনুষ্ঠিত সেই ফাইনালে বোকা জুনিয়র্সের প্রতিপক্ষ ছিল ইউরোপের মহাশক্তিশালী ক্লাব এসি মিলান। আন্দ্রে পিরলো, আন্দ্রি শেভচেঙ্কো, কাকা, মালদিনিদের নিয়ে গড়া এসি মিলানের আক্রমণভাগকে ১২০ মিনিট আটকে রাখেন আবনদানজিয়েরি।
ম্যাচ টাইব্রেকারে গড়ালে আবনদানজিয়েরি তার ক্যারিয়ারের সেরা পারফরম্যান্স প্রদর্শন করেন। তিনি এসি মিলানের আন্দ্রে পিরলো এবং আলেসান্দ্রো কোস্তাকুর্তার পেনাল্টি শট দুর্দান্তভাবে ঠেকিয়ে দেন। বোকা জুনিয়র্স ৩-১ ব্যবধানে টাইব্রেকারে জয়ী হয়ে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয় এবং আবনদানজিয়েরি ম্যাচের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন। এই অনন্য কীর্তির পর ২০০৩ সালে তিনি “দক্ষিণ আমেরিকার সেরা গোলরক্ষক”-এর খেতাব লাভ করেন।

দক্ষিণ আমেরিকায় সব জেতার পর, ২০০৬ সালে ৩৪ বছর বয়সে আবনদানজিয়েরি ইউরোপের ফুটবলে পাড়ি জমান। তিনি স্প্যানিশ লা লিগার ক্লাব হেতাফেতে যোগ দেন। অনেকেই ভেবেছিলেন ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে এসে লা লিগার মতো প্রতিযোগিতাপূর্ণ জায়গায় তিনি হয়তো মানিয়ে নিতে পারবেন না। কিন্তু তিনি সবাইকে ভুল প্রমাণ করেন।
২০০৬-২০০৭ মৌসুমে হেতাফের হয়ে লা লিগায় ৩৬টি ম্যাচে তিনি মাত্র ৩০টি গোল হজম করেন। ফলস্বরূপ, রিয়াল মাদ্রিদের ইকার ক্যাসিয়াস কিংবা বার্সেলোনার ভিক্টর ভালদেসকে পেছনে ফেলে তিনি লা লিগার সেরা গোলরক্ষকের পুরস্কার “জামোরা ট্রফি” জয় করেন। হেতাফেকে ২০০৭ ও ২০০৮ সালে টানা দুবার স্প্যানিশ কোপা দেল রে-র ফাইনালে তুলতে এবং উয়েফা কাপের (বর্তমান ইউরোপা লিগ) কোয়ার্টার ফাইনালে নিয়ে যেতে তিনি অবিশ্বাস্য ভূমিকা পালন করেন।
ঘরোয়া ফুটবলে দুর্দান্ত খেললেও আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে আবনদানজিয়েরির অভিষেক ঘটে কিছুটা দেরিতে। ২০০৪ সালের জুন মাসে প্যারাগুয়ের বিরুদ্ধে এক বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচে ৩২ বছর বয়সে তার অভিষেক হয়। তৎকালীন কোচ মার্সেলো বিয়েলসা তার ওপর আস্থা রাখেন। দ্রুতই তিনি আর্জেন্টিনার এক নম্বর গোলরক্ষক হিসেবে নিজের জায়গা পাকা করেন।
তিনি ২০০৪ এবং ২০০৭ সালের কোপা আমেরিকায় আর্জেন্টিনার মূল গোলরক্ষক ছিলেন। দুইবারই আর্জেন্টিনা ফাইনালে উঠেছিল, তবে দুবারই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলের কাছে হেরে রানার্স-আপ হয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয়।
রবার্তো আবনদানজিয়েরির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় এবং একই সাথে সবচেয়ে দুঃখজনক অধ্যায় ছিল ২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপ। কোচ হোসে পেকারম্যানের অধীনে সেই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা খেলছিল নান্দনিক ফুটবল। কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগের মূল ভরসা ছিলেন “এল পাতো”।

৩০ জুন, ২০০৬; বার্লিনের অলিম্পিক স্টেডিয়ামে কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি স্বাগতিক জার্মানি এবং আর্জেন্টিনা। ম্যাচের ৪৯ মিনিটে রবার্তো আয়ালার গোলে আর্জেন্টিনা ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায়। আর্জেন্টিনার সেমিফাইনালে যাওয়া যখন সময়ের ব্যাপার মনে হচ্ছিল, ঠিক তখনই ঘটে সেই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা।
ম্যাচের ৭০ মিনিটে একটি হাই বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে জার্মানির স্ট্রাইকার মিরোস্লাভ ক্লোসার সাথে প্রচণ্ড ধাক্কা লাগে আবনদানজিয়েরির। তার পাঁজরের হাড়ে মারাত্মক চোট লাগে। যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকা আবনদানজিয়েরি মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন, তার জায়গায় নামানো হয় লিওনার্দো ফ্রাঙ্কিকে।
আবনদানজিয়েরি মাঠ ছাড়ার পর আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগের আত্মবিশ্বাস কিছুটা নড়ে যায়। ৮০ মিনিটে ক্লোসা গোল করে জার্মানিকে সমতায় ফেরান। ম্যাচ টাইব্রেকারে গড়ালে পেনাল্টি স্পেশালিস্ট আবনদানজিয়েরির অভাব হাড়ে হাড়ে টের পায় আর্জেন্টিনা। জার্মানির গোলকিপার ইয়েন্স লেমান দুর্দান্ত পারফর্ম করে আর্জেন্টিনাকে টাইব্রেকারে বিদায় করে দেন। ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, সেদিন যদি আবনদানজিয়েরি ইনজুরিতে না পড়তেন, তবে ২০০৬ বিশ্বকাপের গল্পটা আর্জেন্টিনার জন্য ভিন্ন হতে পারত।
গোলরক্ষক হিসেবে আবনদানজিয়েরি আধুনিক ফুটবলীয় ঘরানার চেয়ে ক্লাসিক ঘরানার বেশি অনুসারী ছিলেন। গোললাইনের ওপর তার রিফ্লেক্স বা প্রতিক্রিয়া দেখানোর গতি ছিল দেখার মতো। পেনাল্টি ঠেকানোর ক্ষেত্রে তিনি স্ট্রাইকারের চোখের দিকে তাকিয়ে মুভমেন্ট বোঝার চেষ্টা করতেন। তার শান্ত ও অবিচলিত চাউনি অনেক সময় পেনাল্টি টেকারকে স্নায়ুচাপে ফেলে দিত।

২০০৯ সালে তিনি পুনরায় তার প্রিয় ক্লাব বোকা জুনিয়র্সে ফিরে আসেন। সেখানে এক বছর খেলার পর ২০১০ সালে তিনি ব্রাজিলের বিখ্যাত ক্লাব ইন্টারনাসিওনাল -এ যোগ দেন। সেই বছরই তিনি ক্লাবটির হয়ে ক্যারিয়ারের চতুর্থ কোপা লিবের্তাদোরেস শিরোপা জিতেন। ২০১০ সালের ক্লাব বিশ্বকাপে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচের পর, ৩৮ বছর বয়সে তিনি পেশাদার ফুটবলকে বিদায় জানান।
অবসরের পর আবনদানজিয়েরি ফুটবলের সাথেই যুক্ত থাকেন। তার দীর্ঘদিনের সতিনিধি ও বোকা জুনিয়র্সের সতীর্থ মার্টিন পালের্মোর সাথে সহকারী কোচ হিসেবে কাজ শুরু করেন। তারা দুজনে মিলে গডয় ক্রুজ, আর্সেনাল ডি সারান্দি এবং চিলির ক্লাব ইউনিয়ন এস্পানিওলা-তে কোচিং করিয়েছেন।
ফুটবল ছাড়াও আবনদানজিয়েরির আরেকটি বড় শখ হলো মোটর রেসিং। অবসরের পর তিনি আর্জেন্টিনার স্থানীয় ‘টপ রেস ভি৬’ নামক কার রেসিং প্রতিযোগিতায় একজন পেশাদার রেসার হিসেবে অংশ নিয়েছিলেন, যা তার বহুমুখী প্রতিভার পরিচয় দেয়।
রবার্তো আবনদানজিয়েরি সম্পর্কে কিছু রোমাঞ্চকর তথ্যxa0
১. তাকে সবাই “এল পাতো” (স্প্যানিশ ভাষায় যার অর্থ হাঁস) নামে ডাকত। এই নামটির পেছনে কোনো ফুটবলীয় কারণ ছিল না; বরং শৈশবে তার হাঁটার ধরণ এবং শারীরিক গড়ন কিছুটা হাঁসের মতো ছিল বলেই বন্ধুরা তাকে এই নামে ডাকা শুরু করে।xa0
২. ফুটবল থেকে অবসর নেওয়ার পর আবনদানজিয়েরি তার শৈশবের আরেকটি বড় শখ পূরণ করেন। তিনি একজন পেশাদার কার রেসার বনে যান। ২০১১ সালে তিনি আর্জেন্টিনার বিখ্যাত ‘টপ রেস ভি৬’ সিরিজের রেসিং প্রতিযোগিতায় অংশ নেন এবং ট্র্যাক মাতান।
৪. ২০০৬ সালে স্প্যানিশ ক্লাব হেতাফেতে যোগ দেওয়ার পর, ৩৬ ম্যাচে মাত্র ৩০ গোল হজম করে তিনি লা লিগার সেরা গোলরক্ষকের পুরস্কার “জামোরা ট্রফি” জেতেন।xa0
৪. ২০০৬ বিশ্বকাপে জার্মানির বিরুদ্ধে কোয়ার্টার ফাইনালে মিরোস্লাভ ক্লোসার সাথে ধাক্কা লেগে তিনি যখন মাঠ ছাড়েন, আর্জেন্টিনা ১-০ গোলে এগিয়ে ছিল। তিনি মাঠ ছাড়ার পর আর্জেন্টিনা পেনাল্টি শুটআউটে হেরে বিদায় নেয়। মজার ও দুঃখের ব্যাপার হলো, আবনদানজিয়েরি ছিলেন একজন পেনাল্টি স্পেশালিস্ট। আর্জেন্টিনা ভক্তদের বিশ্বাস, সেদিন তিনি ইনজুরিতে না পড়লে টাইব্রেকারে গল্পটা অন্যরকম হতে পারত।
৫. ২০০৩ সালের ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপে বোকা জুনিয়র্সের হয়ে তিনি ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন এসি মিলানের বিরুদ্ধে টাইব্রেকারে আন্দ্রে পিরলো এবং কোস্তাকুর্তার মতো তারকাদের পেনাল্টি শট ঠেকিয়ে দেন। বোকা বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয় এবং তিনি ম্যাচ সেরা হন।xa0
৬. ২০১০ সালে ক্যারিয়ারের একদম শেষ প্রান্তে এসে ব্রাজিলের ক্লাব ইন্টারনাসিওনালের হয়ে তিনি তার ক্যারিয়ারের ৪র্থ কোপা লিবের্তাদোরেস শিরোপা জিতেন। ৩৮ বছর বয়সেও মহাদেশীয় ট্রফি জেতা তার দীর্ঘমেয়াদী ফিটনেস ও দক্ষতার প্রমাণ দেয়।
Reference:

