Image default
কুয়েতজাদুঘরপর্যটন আকর্ষণ

কুয়েতের অদ্ভুত সুন্দর ‘মিরর হাউস’ ও এক ইতালীয় শিল্পীর গল্প

কাচের তৈরি মেঝে টিকিয়ে রাখতে এই বাড়িতে জুতো তো দূরের কথা, খালি পায়ে হাঁটাও নিষেধ—এখানে ঢুকলেই আপনাকে স্পেশাল মোজা পরে একদম ‘আইস স্কেটিং’ করার ফিল নিয়ে পিছলে পিছলে ঘুরতে হবে!xa0

মিরর হাউস বিশ্বের একমাত্র বাড়ি যার ভেতরের এবং বাইরের প্রতিটি দেওয়াল, ছাদ, মেঝে এমনকি আসবাবপত্রও সম্পূর্ণভাবে কোটি কোটি আয়না বা কাচের টুকরো দিয়ে মোজাইক করে সাজানো হয়েছে। কোনো বড় কর্পোরেট বা সরকারি অনুদান ছাড়া, স্রেফ একজন শিল্পীর একক প্রচেষ্টা এবং ভালোবাসায় গড়ে ওঠা এই বাড়িটি আজ কুয়েতের সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ এবং গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে স্থান পাওয়ার মতো এক অনন্য বিস্ময়।xa0

এক নজরে মিরর হাউসের কিছু রোমাঞ্চকর তথ্য

বিষয় বিবরণ
অবস্থান ক্বাদসিয়া, কুয়েত সিটি
প্রধান শিল্পী লিডিয়া আল-কাত্তান (ইতালীয়-কুয়েতি শিল্পী)
নির্মাণ সময় ১৯৭২ থেকে শুরু করে প্রায় ৪০ বছর
ব্যবহৃত কাচ প্রায় ৭৭ টন ওজনের কোটি কোটি আয়নার টুকরো
বিশেষত্ব বিশ্বের একমাত্র সম্পূর্ণ কাচ ও আয়নার তৈরি আবাসিক বাড়ি
মিরর হাউস- Image Source: makemytrip.com

এই বাড়িটি কেবল একটি শিল্পকর্ম নয়, এটি মূলত দুই শিল্পীর প্রেম, নিষ্ঠা এবং ত্যাগের এক জীবন্ত মহাকাব্য। বাড়িটির মালিক ছিলেন কুয়েতের বিখ্যাত চিত্রশিল্পী ও ভাস্কর খলিফা আল-কাত্তান (কুয়েতের আধুনিক শিল্পকলার জনক)। ১৯৬০ সালে তিনি ইতালীয় বংশোদ্ভূত দূরদর্শী শিল্পী ও কবি লিডিয়া আল-কাত্তান-কে বিয়ে করে এই বাড়িতে বসবাস শুরু করেন।

১৯৭২ সালে একটি ছোট ঘটনার মাধ্যমে এই বাড়িটি কাচের বাড়িতে রূপ নেওয়ার যাত্রা শুরু হয়। একদিন লিডিয়া লক্ষ্য করেন যে, তাঁদের ছোট্ট মেয়ে জাবিন ঘরের একটি দেওয়ালে স্ক্র্যাচ করে বা দাগ কেটে নষ্ট করে ফেলেছে। লিডিয়া সেই দেওয়ালটি সাধারণ রং দিয়ে ঢেকে না দিয়ে, ভাঙা আয়নার টুকরো দিয়ে একটি চমৎকার নকশা তৈরি করে ফেলেন। খলিফা আল-কাত্তান যখন বাড়ি ফিরে স্ত্রীর এই অদ্ভুত সুন্দর কাজ দেখেন, তিনি মুগ্ধ হয়ে যান এবং লিডিয়াকে পুরো বাড়িটিকেই নিজের ক্যানভাস বানিয়ে নেওয়ার অনুপ্রেরণা দেন। এরপর থেকে শুরু হয় এক দীর্ঘ এবং অক্লান্ত সাধনা।

মিরর হাউসের সবচেয়ে অবিশ্বাস্য তথ্য হলো, এই বিশাল বাড়ির প্রতিটি কাচ লিডিয়া আল-কাত্তান নিজের হাতে কেটে দেওয়ালে বসিয়েছেন। ১৯৭২ সালে শুরু হওয়া এই কাজ সম্পূর্ণ শেষ হতে সময় লেগেছে প্রায় ৪০ বছর!

লিডিয়া কোনো সাধারণ আঠা ব্যবহার করেননি, কারণ কুয়েতের গ্রীষ্মকালীন তাপমাত্রা যখন ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়, তখন সাধারণ আঠা গলে কাচগুলো খসে পড়তে পারত। এই জন্য তিনি নিজেই সাদা সিমেন্ট এবং বিশেষ কিছু উপাদানের মিশ্রণে একটি নিজস্ব ফর্মুলা বা আঠা তৈরি করেন, যা বছরের পর বছর ধরে এই কাচগুলোকে ধরে রেখেছে। পুরো বাড়িটি সাজাতে আনুমানিক ৭৭ টন কাচ ও আয়না ব্যবহার করা হয়েছে, যা লিডিয়া নিজে স্ক্র্যাপ বা ভাঙা কাচের দোকান থেকে সংগ্রহ করেছিলেন।

মিরর হাউসের ভেতরে জাদুকরী আলো-ছায়া- Image Source: tiplr.com

মিরর হাউসের ভেতরে প্রবেশ করলে মনে হবে আপনি কোনো এক ভিন্ন গ্রহ বা জাদুকরী আলো-ছায়ার রাজ্যে প্রবেশ করেছেন। প্রতিটি ঘরের একটি নির্দিষ্ট থিম বা গল্প রয়েছে, যা লিডিয়া তাঁর নিখুঁত কাচের কাজের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন:

বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়েই আপনি এর বিশালত্ব টের পাবেন। বাইরের দেওয়ালে কাচের টুকরো দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে বিশাল আকৃতির প্রজাপতি, পাখি এবং মরুভূমির গাছপালা। দিনের আলো যখন এই দেওয়ালে পড়ে, তখন পুরো বাড়িটি হীরার মতো চকচক করতে থাকে।

কুয়েত একটি উপকূলীয় দেশ হওয়ায় এর লোকগাথায় সমুদ্রের এক বিশাল ভূমিকা রয়েছে। মলের একটি পুরো ঘর উৎসর্গ করা হয়েছে সমুদ্রের জীবনকে। দেওয়ালে আয়নার টুকরো দিয়ে হাঙ্গর, তিমি, ডলফিন এবং সমুদ্রের ঢেউয়ের এমন নিখুঁত ছবি আঁকা হয়েছে যে, ঘরের আলো জ্বললে মনে হবে আপনি নিজে সমুদ্রের তলদেশে দাঁড়িয়ে আছেন।

এই ঘরটি বিজ্ঞান ও দর্শনের এক অপূর্ব মিশ্রণ। ছাদ এবং দেওয়ালে কাচের টুকরো দিয়ে আমাদের সৌরজগৎ, গ্যালাক্সি, উল্কাপাত এবং নক্ষত্রমণ্ডলী ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ঘরটির লাইটিং এমনভাবে করা হয়েছে যে, আয়নার প্রতিফলনে তৈরি হওয়া বিন্দু বিন্দু আলো আপনাকে মহাশূন্যে ভেসে থাকার অনুভূতি দেবে।

এখানে কাচের মাধ্যমে প্রকৃতির সবুজ রূপ, ফুল এবং পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। প্রতিকূল মরুভূমির দেশে প্রকৃতির এই রূপটি এক অন্যরকম প্রশান্তি দেয়।

মিরর হাউস কেবল দেখার জায়গা নয়, এটি একটি অনুভূতি। ট্যুর চলাকালীন লিডিয়া নিজেই দর্শকদের বিভিন্ন ঘরে নিয়ে যান এবং ঘরের থিমের সাথে মিলিয়ে বিশেষ লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো প্রদর্শন করেন।

আয়নার ওপর আলোর এই প্রতিফলন এবং ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক মানুষের মনে এক অদ্ভুত মানসিক প্রশান্তি দেয়। অনেক গবেষক এবং দর্শনার্থী মন্তব্য করেছেন যে, এই বাড়ির নির্দিষ্ট কিছু ঘরে কিছুক্ষণ সময় কাটালে মানসিক চাপ বা ডিপ্রেশন দূর হয়ে যায়। একে এক ধরনের ‘ভিজ্যুয়াল থেরাপি’ বলা যেতে পারে।

২০০০ সালে খলিফা আল-কাত্তান মৃত্যুবরণ করার পর, লিডিয়া এই বাড়িটিকে একটি ব্যক্তিগত জাদুঘর বা আর্ট গ্যালারিতে রূপান্তর করেন। বর্তমানে লিডিয়া আল-কাত্তানের বয়স আশি বছরেরও বেশি, কিন্তু এখনও তিনি সমান উৎসাহে দেশ-বিদেশ থেকে আসা পর্যটকদের নিজে ঘুরে ঘুরে এই বাড়িটি দেখান এবং এর পেছনের গল্প শোনান।

এটি কোনো সাধারণ বাণিজ্যিক জাদুঘর নয়, এটি লিডিয়ার নিজস্ব বাসস্থান। তাই এখানে যেতে হলে অন্তত একদিন আগে তাদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট বা ফোনের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট বা অনুমতি নিতে হয়।

মিরর হাউসের ভেতরের দৃশ্য- Image Source: haiou7aleeb.wordpress.com

বাড়ির কাচের মেঝের সুরক্ষার জন্য দর্শনার্থীদের ভেতরের জুতো পরে ঢোকা নিষেধ। সবাইকে বিশেষ নরম মোজা বা স্লিপার দেওয়া হয় ভেতরে হাঁটার জন্য।

কুয়েতের বিখ্যাত ‘মিরর হাউস’ কিছু অবাক করা এবং রোমাঞ্চকর তথ্য

১.আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশ বা আরব্য সংস্কৃতিতে একটি সাধারণ কুসংস্কার রয়েছে যে বাড়িতে ভাঙা আয়না বা কাচ রাখলে দুর্ভাগ্য বা অমঙ্গল আসে। ইতালীয় শিল্পী লিডিয়া আল-কাত্তান যখন পুরো বাড়ি ভাঙা কাচ দিয়ে সাজানোর সিদ্ধান্ত নেন, তখন চারপাশের অনেকেই তাঁকে এই কুসংস্কারের কথা বলে ভয় দেখিয়েছিলেন। কিন্তু লিডিয়া এই অন্ধবিশ্বাসকে চ্যালেঞ্জ করেন। তিনি প্রমাণ করেন যে, সৃজনশীলতা আর ভালোবাসা থাকলে মানুষের চোখে ‘বর্জ্য’ বা ‘অশুভ’ জিনিস দিয়েও পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ও পজিটিভ একটি স্বর্গ তৈরি করা সম্ভব।

২. ১৯৬৬ সালে খলিফা আল-কাত্তান যখন একটি আর্ট এক্সিবিশনের জন্য দেশের বাইরে (আমেরিকায়) যান, তখন লিডিয়া তাঁকে একটি সারপ্রাইজ দেওয়ার পরিকল্পনা করেন। ঘরে একটি পুরোনো কাঠের তৈরি বুকশেলফ ছিল যা কিছুটা বিবর্ণ হয়ে পড়েছিল। সেটি রং করার জন্য লিডিয়া ঘরে কোনো রং খুঁজে পাননি। তখন হুট করেই তাঁর মাথায় বুদ্ধি আসে এবং তিনি কিছুদিন আগে তাঁর ৩ বছরের ছোট্ট মেয়ের হাত থেকে ভেঙে যাওয়া একটি আয়নার টুকরোগুলো আঠা দিয়ে সেই বুকশেলফে বসিয়ে দেন। খলিফা দেশে ফিরে স্ত্রীর এই জাদুকরী আইডিয়া দেখে এতটাই মুগ্ধ হন যে, তিনি লিডিয়াকে পুরো বাড়িতে এই কাজ করার জন্য সবুজ সংকেত দেন।

৩.xa0 ১৯৮১ সালে এই কাচের বাড়ির ওপর এক বড় বিপর্যয় নেমে আসে। বাড়ির প্রধান লিভিং রুমে (যা এখন প্ল্যানেট আর্থ হল) হঠাৎ করেই মারাত্মকভাবে উইপোকার আক্রমণ ঘটে। উইপোকাগুলো দেওয়ালে লাগানো কাঠের প্যানেলগুলোর ভেতরের অংশ খেয়ে ধ্বংস করে ফেলে, যার ফলে লিডিয়ার বছরের পর বছর ধরে করা কাচের কাজ ভেঙে পড়ে যায়। দমে না গিয়ে লিডিয়া ১৯৮১ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ তিন বছর নিজেকে নতুন প্রযুক্তি শেখান কীভাবে কোনো কাঠের সাপোর্ট ছাড়াই সরাসরি সিমেন্টের দেওয়ালে কাচ স্থায়ীভাবে বসানো যায়। ১৯৮৫ সাল থেকে তিনি নতুন উদ্যমে ‘ফেইজ ২’-এর কাজ শুরু করেন।

মিরর হাউস- Image Source: atlasobscura.com

৪. মিরর হাউস কোনো সাধারণ বাণিজ্যিক মিউজিয়াম নয়, এটি এখনো লিডিয়া আল-কাত্তানের নিজস্ব থাকার বাড়ি। তাই এখানে ঘুরতে যাওয়া দর্শকদের তিনি কেবল একজন গাইড হিসেবে নয়, নিজের অতিথি হিসেবে আপ্যায়ন করেন। ট্যুর শেষে লিডিয়া নিজের হাতে বানানো সুস্বাদু কেক, জুস এবং তাঁর বিখ্যাত ‘দারুচিনির চা’ দিয়ে দর্শকদের আপ্যায়ন করেন। বিলাসবহুল ড্রইংরুমে বসে এই চা পানের অভিজ্ঞতা পর্যটকদের কাছে অন্যতম প্রিয় স্মৃতি।

৫. মিরর হাউসের মেঝেগুলোও নিখুঁত কাচের মোজাইক দিয়ে তৈরি। এই মেঝের ওপর যাতে কোনো দাগ না পড়ে বা কাচ ভেঙে না যায়, সেজন্য কোনো দর্শনার্থীকে জুতো বা স্যান্ডেল পরে ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয় না। এমনকি খালি পায়ে হাঁটাও নিষেধ। কর্তৃপক্ষ থেকে প্রতিটি দর্শনার্থীকে বিশেষ এক ধরনের নরম এবং স্লিপ-প্রুফ মোজা দেওয়া হয়, যা পরে কাচের ওপর দিয়ে পিছলে না গিয়ে আরামদায়কভাবে হেঁটে পুরো বাড়ি ঘুরে দেখা যায়।

Reference:

Related posts

সুংগাই পান্ডান জলপ্রপাত প্রকৃতির মাঝে শান্ত ভ্রমণ

ব্লু মসজিদ: ইস্তাম্বুলের নীল সৌন্দর্যের প্রতীক

আশা রহমান

কুয়েতের স্বাধীনতা ও আধুনিকতার মহাকাব্য লিবারেশন টাওয়ার

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More