Image default
ক্রীড়াবিদজীবনীফুটবল

গোলবারের নিচে এক ভরসার নাম ব্রিস সাম্বা

জন্ম কঙ্গোয় হলেও ফরাসি প্রাচীর হয়ে ওঠা ব্রিস সাম্বার রক্তেই ছিল ফুটবল, কারণ তার বাবাও ছিলেন কঙ্গো জাতীয় দলের গোলরক্ষক। আর জিব্রাল্টারের বিপক্ষে পুরো ৯০ মিনিট খেলে ফ্রান্সের জার্সিতে যখন তার অভিষেক হয়, তখন বাপের বেটা হিসেবে গোলবার সামলানোর পারিবারিক ঐতিহ্যটাই তিনি আন্তর্জাতিক মঞ্চে ফুটিয়ে তুলেছিলেন!

ক্যারিয়ারের শুরুর ১০ বছর তাকে কেউ পাত্তাই দেয়নি, আর আজ তিনি ফ্রান্স জাতীয় দলের ড্রেসিংরুমে এমবাপের পাশে বসে চা খান! ব্রিস সাম্বার ক্যারিয়ারের গ্রাফটা আসলে ক্রিপ্টোকারেন্সির মতো হুট করে এমন এক লাফ দিয়েছে যে নটিংহ্যাম থেকে প্যারিস, সবাই এখন তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। পোস্টের নিচে তার উপস্থিতি মানেই প্রতিপক্ষের ফরওয়ার্ডদের জন্য গোল করার মিশন ইম্পসিবল!xa0

ব্রিস সাম্বা- এর ব্যক্তিগত তথ্য:

নামxa0

ব্রিস লরিশ সাম্বা

জন্ম xa0

২৫ এপ্রিল ১৯৯৪ (বয়স ৩২)

জন্মস্থানxa0

লিনজোলো , কঙ্গো প্রজাতন্ত্র

উচ্চতাxa0

১.৮৭ মিটার (৬ ফুট ২ ইঞ্চি)

পজিশনxa0

গোলকিপার

ক্লাব ক্যারিয়ার

লে হাভরে,মার্সেই,ন্যান্সি,কায়েন,নটিংহাম ফরেস্ট,লেন্স এবং বর্তমানে রেনেস ক্লাবের হয়ে খেলছেন।

আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার

২০২৩– ফ্রান্স

ব্রিস লরিশ সাম্বা- Image Source: wikimedia.org

ব্রিস সাম্বা ১৯৯৪ সালের ২৫ এপ্রিল কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের লিনজলো নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন। তার ফুটবলার হওয়ার পেছনে পারিবারিক ঐতিহ্য এক বড় ভূমিকা পালন করেছে। তার বাবা, ব্রিস সাম্বা সিনিয়র, ছিলেন কঙ্গো জাতীয় দলের একজন সাবেক গোলরক্ষক। ফলে গোলপোস্টের নিচে দাঁড়ানোর প্রাথমিক দীক্ষা সাম্বা তার বাবার কাছ থেকেই পেয়েছিলেন।

সাম্বার বয়স যখন মাত্র কয়েক বছর, তখন তার পরিবার কঙ্গো ছেড়ে ফ্রান্সে চলে আসে। ফ্রান্সের নরম্যান্ডি অঞ্চলে তার শৈশব কাটে। সেখানেই স্থানীয় ক্লাবগুলোর হয়ে তার ফুটবলীয় যাত্রা শুরু হয়। কঙ্গোর নাগরিকত্ব থাকলেও সাম্বা ফ্রান্সে বেড়ে ওঠার কারণে ফরাসি ফুটবল সংস্কৃতির সাথেই নিজেকে জড়িয়ে নেন এবং পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক ফুটবলের জন্য ফ্রান্সকেই বেছে নেন।

ফ্রান্সের বিখ্যাত যুব একাডেমি ‘লে হাভ্রে’ থেকে সাম্বার পেশাদার ক্যারিয়ার শুরু হয়। এই একাডেমি থেকেই পল পগবা, রিয়াদ মাহরেজ এবং দিমিত্রি পায়েতের মতো বিশ্বমানের তারকারা উঠে এসেছেন। লে হাভ্রে-র হয়ে মাত্র ১৬ বছর বয়সে মূল দলে ডাক পান তিনি।

তার প্রতিভা দেখে ২০১৩ সালে ফরাসি জায়ান্ট অলিম্পিক মার্সেই তাকে দলে ভেড়ায়। মার্সেইর মতো বড় ক্লাবে যোগ দেওয়াটা সাম্বার জন্য অনেক বড় সুযোগ ছিল, কিন্তু সেখানে তৎকালীন এক নম্বর গোলরক্ষক স্টিভ মান্দান্দার উপস্থিতির কারণে সাম্বাকে মূলত বেঞ্চেই বসে কাটাতে হয়। মার্সেইতে থাকা চার বছরে তিনি মাত্র কয়েকটি ম্যাচ খেলার সুযোগ পান। নিয়মিত খেলার সুযোগের অভাবে এই সময় তাকে ন্যান্সি ক্লাবে ধারে পাঠানো হয়, কিন্তু সেখানেও তিনি খুব একটা সুবিধা করতে পারেননি।xa0

২০১৭ সালে মার্সেই ছেড়ে সাম্বা যোগ দেন ফ্রেঞ্চ ক্লাব কঁ-এ। প্রথম মৌসুমে তিনি ব্যাকআপ গোলরক্ষক হিসেবে থাকলেও, ২০১৮-১৯ মৌসুমে তিনি ক্লাবের এক নম্বর গোলরক্ষক হন। সেই মৌসুমে কঁ লিগ ওয়ান থেকে রেলিগেটেড হয়ে গেলেও, সাম্বার ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স ছিল দুর্দান্ত। পুরো মৌসুমে তার অসাধারণ সব সেভ ইউরোপের বেশ কয়েকটি ক্লাবের নজর কাড়ে।

নটিংহ্যাম ফরেস্টে ব্রিস সাম্বা- Image Source: bbc.com

২০১৯ সালের গ্রীষ্মে ব্রিস সাম্বা ইংল্যান্ডের চ্যাম্পিয়নশিপের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব নটিংহ্যাম ফরেস্টে যোগ দেন। ইংল্যান্ডের শারীরিক ও গতিময় ফুটবলের সাথে তিনি খুব দ্রুত নিজেকে মানিয়ে নেন। প্রথম মৌসুমেই তিনি চ্যাম্পিয়নশিপের অন্যতম সেরা গোলরক্ষক হিসেবে বিবেচিত হন।

তবে সাম্বার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে মহাকাব্যিক অধ্যায়টি রচিত হয় ২০২১-২২ মৌসুমে। নটিংহ্যাম ফরেস্টকে দীর্ঘ ২৩ বছর পর ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে ফিরিয়ে আনার পেছনে সাম্বা ছিলেন প্রধান নায়ক। প্রিমিয়ার লিগে ওঠার প্লে-অফ সেমিফাইনালের দ্বিতীয় লেগে শেফিল্ড ইউনাইটেডের বিপক্ষে ম্যাচটি টাইব্রেকারে গড়ায়। সেখানে ব্রিস সাম্বা অতিমানবীয় পারফরম্যান্স প্রদর্শন করেন। তিনি প্রতিপক্ষের তিনটি পেনাল্টি শট রুখে দিয়ে নটিংহ্যামকে ফাইনালে তোলেন।

ওয়েম্বলিতে অনুষ্ঠিত ফাইনালে হাডার্সফিল্ডের বিপক্ষে ক্লিন শিট বজায় রেখে দলকে ১-০ ব্যবধানে জেতান এবং নটিংহ্যাম ফরেস্ট প্রিমিয়ার লিগে উন্নীত হয়। নটিংহ্যাম সমর্থকদের কাছে সাম্বা রাতারাতি এক ‘কাল্ট হিরো’ বা অমর নেতায় পরিণত হন।

আরসি লঁস-এ ব্রিস সাম্বা- Image Source: madeinlensois.ouest-france.fr

প্রিমিয়ার লিগে খেলার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও, ২০২২ সালের গ্রীষ্মে সাম্বা ফ্রান্সে ফিরে আসার এক চমকপ্রদ সিদ্ধান্ত নেন এবং আরসি লঁস-এ যোগ দেন। ২০২২-২৩ মৌসুমটি লঁস এবং সাম্বা উভয়ের জন্যই ছিল স্বপ্নের মতো। পুরো মৌসুমে সাম্বা মাত্র ২৯টি গোল হজম করেন এবং ১৫টি ম্যাচে ক্লিন শিট রাখেন। পিএসজির মতো তারকাখচিত দলকে শক্ত চ্যালেঞ্জ জানিয়ে লঁস লিগ ওয়ানে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে এবং দীর্ঘ দুই দশক পর চ্যাম্পিয়ন্স লিগে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে।

সাম্বা তার এই অনবদ্য পারফরম্যান্সের জন্য লিওনেল মেসির পিএসজি বা অন্য বড় ক্লাবের গোলরক্ষকদের পেছনে ফেলে “লিগ ওয়ান গোলকিপার অব দ্য ইয়ার” পুরস্কার জিতে নেন। ২০২৩ সাল থেকে তিনি লঁস দলের অধিনায়কের দায়িত্বও পালন করছেন এবং ২০২৫-২৬ মৌসুমেও তিনি ফরাসি লিগের অন্যতম সেরা গোলরক্ষক হিসেবে নিজের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছেন।

ফ্রান্সের মতো দেশ, যেখানে গোলপোস্টের নিচে মাইক ম্যাগনান, আলফনসে আরিওলাদের মতো তারকাদের ভিড়, সেখানে ২৯ বছর বয়সে জাতীয় দলে ডাক পাওয়াটা অলৌকিক কিছু ছিল। কিন্তু লঁস-এর হয়ে সাম্বার ধারাবাহিক পারফরম্যান্স ফ্রান্সের কোচ দিদিয়ের দেশমকে বাধ্য করে তাকে দলে নিতে।

২০২৩ সালের মার্চ মাসে নেদারল্যান্ডস ও আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের জন্য তিনি প্রথমবার ফ্রান্স জাতীয় দলে ডাক পান। ওই বছরের জুনে জিব্রাল্টারের বিপক্ষে ম্যাচে ফ্রান্সের জার্সিতে তার অভিষেক হয়, যেখানে তিনি ক্লিন শিট বজায় রাখেন। হুগো লরিসের অবসরের পর মাইক মিয়াঁর ব্যাকআপ হিসেবে তিনি ফ্রান্সের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠেন। তিনি ফ্রান্সের ইউরো ২০২৪ স্কোয়াডের অংশ ছিলেন এবং ২০২৬ বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জন পর্বেও নিয়মিত ফরাসি স্কোয়াডে নিজের জায়গা ধরে রেখেছেন।

২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য যে ২৬ সদস্যের শক্তিশালী ফ্রান্স স্কোয়াড ঘোষণা করেছেন, সেখানে গোলরক্ষক হিসেবে জায়গা করে নিয়েছেন ব্রিস সাম্বা। বিশ্বকাপের মঞ্চেও ফ্রান্সের ড্রেসিংরুম এবং দলের অন্যতম অভিজ্ঞ চালিকাশক্তি হিসেবে সাম্বার ভূমিকা থাকবে অপরিসীম। ফুটবলপ্রেমীদের কাছে ব্রিস সাম্বা লড়াকু মানসিকতার এক জীবন্ত প্রতীক।

Reference:

Related posts

জাইমা রহমান- বিএনপির নেতৃত্ব সংকট ও জাইমা রহমানের সুযোগ

আশা রহমান

ইব্রাহিম ট্রাওরে কে? যিনি পশ্চিমাদের চোখে চোখ রেখে কথা বলেন

শেখ আহাদ আহসান

শাকিব খানের জীবনের অজানা অধ্যায়: ক্যারিয়ার, প্রেম ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More