Image default
ক্রীড়াবিদজীবনীফুটবল

থিও হার্নান্দেজ: ফরাসি দুর্গের বাম প্রান্তের প্রহরী

বড় ভাই ইনজুরিতে মাঠ ছাড়লেন আর ছোট ভাই এসে পুরো বিশ্বকাপটাই নিজের বানিয়ে নিলেন হার্নান্দেজ পরিবারে একেই বোধহয় বলে ‘এক টিকিটে দুই ছবি’! 

কাতার বিশ্বকাপের সেই দৃশ্যটি ফরাসি ফুটবল ভক্তরা হয়তো কোনোদিন ভুলবেন না বড় ভাই লুকাস হার্নান্দেজ ইনজুরিতে পড়ে মাঠ ছাড়ছেন, আর তার জায়গায় বুক ভরা আত্মবিশ্বাস নিয়ে মাঠে ঢুকছেন ছোট ভাই থিও হার্নান্দেজ। সেই শুরু, এরপর আর তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। আল হিলালের জার্সিতে মাঠ কাঁপিয়ে এবার ২০২৬-এর উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপে ফ্রান্সের ট্রাম্প কার্ড হিসেবে হাজির হয়েছেন থিও। মাঠের বাম প্রান্ত দিয়ে তার সেই বিদ্যুৎগতির ওভারল্যাপিং রান আর প্রতিপক্ষের ডিফেন্স চূর্ণ করার সহজাত ক্ষমতা আরও একবার বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখাচ্ছে ফরাসিদের।

থিও হার্নান্দেজ-এর ব্যক্তিগত তথ্য:

নাম

থিও বার্নার্ড ফ্রাঁসোয়া হার্নান্দেজ

জন্ম

৬ অক্টোবর ১৯৯৭ (বয়স ২৮)

জন্মস্থান

মার্সেই , ফ্রান্স

উচ্চতা

১.৮৪ মিটার (৬ ফুট ০ ইঞ্চি)

পজিশন

লেফট-ব্যাক

ক্লাব ক্যারিয়ার

অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ বি,দেপোর্তিভো আলাভেস,রিয়াল মাদ্রিদ,রিয়াল সোসিয়েদাদ,এসি মিলান এবং বর্তমানে আল হিলাল ক্লাবের হয়ে খেলছেন।

আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার

২০২১– ফ্রান্স

থিও হার্নান্দেজ – Image Source: tv9bangla.com

১৯৯৭ সালের ৬ অক্টোবর ফ্রান্সের মার্শেই শহরে জন্ম নেন থিও বার্নার্ড ফ্রাঁসোয়া হার্নান্দেজ। তার ফুটবলার হয়ে ওঠার পেছনে পারিবারিক সংযোগ ছিল বেশ গভীর। থিও-র বাবা জিন-ফ্রাঁসোয়া হার্নান্দেজ ছিলেন নব্বইয়ের দশকের একজন সুপরিচিত পেশাদার ফুটবলার, যিনি সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার হিসেবে মার্সেই, অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ এবং রায়ো ভায়েকানোর মতো ক্লাবে খেলেছেন। বাবার ফুটবলীয় জিনের প্রভাব থিও এবং তার বড় ভাই লুকাস হার্নান্দেজের ওপর পড়তে বেশি সময় লাগেনি।

তবে থিও যখন খুব ছোট, তখন তাদের বাবা পরিবার ছেড়ে চলে যান। মা একাই দুই ছেলেকে স্পেনে বড় করে তোলেন। চরম অর্থনৈতিক ও মানসিক সংগ্রামের মধ্যেও মা তাদের ফুটবল খেলার স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। ২০০৭ সালে মাত্র নয় বছর বয়সে থিও হার্নান্দেজ স্প্যানিশ ক্লাব অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের যুব একাডেমিতে যোগ দেন। সেখানে তার প্রতিভা দ্রুত সবার নজর কাড়ে। ২০১৬ সালে অ্যাটলেটিকোর সিনিয়র রিজার্ভ দলে খেলার পাশাপাশি তিনি আলাভেস ক্লাবে ধারে খেলতে যান। আলাভেসের হয়ে ২০১৬-১৭ সিজনে তার দুর্দান্ত পারফরম্যান্স স্পেনের বড় বড় ক্লাবগুলোর নজর কাড়ে।

দেপোর্তিভো আলাভেস এর জার্সিতে থিও হার্নান্দেজ – Image Source: www.transfermarkt.com

২০১৭ সালে অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের একাডেমির প্রোডাক্ট হওয়া সত্ত্বেও তাদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রিয়াল মাদ্রিদ ২৪ মিলিয়ন ইউরোর রিলিজ ক্লজ পরিশোধ করে থিও হার্নান্দেজকে সরাসরি দলে ভেড়ায়। মাদ্রিদের দুই ক্লাবের মধ্যকার ঐতিহাসিক “নন-অ্যাগ্রেশন প্যাক্ট” (একে অপরের খেলোয়াড় সরাসরি না কেনার অলিখিত চুক্তি) ভেঙে থিও-র এই দলবদল স্পেনে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দিয়ে থিও উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, সুপার কাপ এবং ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পান। তবে সেখানে কিংবদন্তি লেফট-ব্যাক মার্সেলোর উপস্থিতির কারণে তিনি নিয়মিত খেলার সুযোগ পাচ্ছিলেন না। রিয়াল মাদ্রিদ তাকে রিয়াল সোসিয়েদাদে ধারে পাঠায়, কিন্তু থিও-র ক্যারিয়ারের আসল মোড় ঘোরানো বাকি ছিল ইতালিতে।

২০১৯ সালের জুলাই মাসে ইতালিয়ান জায়ান্ট এসি মিলানের টেকনিক্যাল ডিরেক্টর এবং ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা ডিফেন্ডার পাওলো মালদিনি নিজে উদ্যোগী হয়ে থিও হার্নান্দেজকে মিলানে নিয়ে আসেন। মালদিনি থিও-র মধ্যে নিজের তরুণ বয়সের ছায়া দেখতে পেয়েছিলেন। আর মিলানের বিখ্যাত সান সিরো স্টেডিয়ামই হয়ে ওঠে থিও-র নিজেকে বিশ্বসেরা হিসেবে প্রমাণ করার আসল মঞ্চ।

এসি মিলানের তৎকালীন কোচ স্তেফানো পিওলি তাকে মাঠে স্বাধীনভাবে আক্রমণে ওঠার লাইসেন্স দেন। থিও শুধু উইং ধরে ক্রসই করতেন না, বরং মাঝমাঠ দিয়ে বল ড্রিবল করে সরাসরি প্রতিপক্ষের পেনাল্টি বক্সে ঢুকে যেতেন। ডিফেন্ডার হয়েও তার এই গোল করার ক্ষুধা ও স্কিল মিলানকে দীর্ঘ ১১ বছর পর ২০২১-২২ সিজনে স্কুডেট্টো জেতাতে প্রধান ভূমিকা পালন করে।

থিও হার্নান্দেজ এর গোল উদযাপন – Image Source: www.charitystars.com

ফুটবলীয় প্রাইম টাইমে থাকা অবস্থাতেই ২০২৫ সালের জুলাই মাসে থিও হার্নান্দেজ ফুটবল বিশ্বকে চমকে দিয়ে ইউরোপের পাঠ চুকিয়ে সৌদি প্রো লিগের জায়ান্ট ক্লাব আল হিলালে যোগ দেন। অনেক ফুটবল বিশেষজ্ঞই ধারণা করেছিলেন, মধ্যপ্রাচ্যের ফুটবলে যোগ দেওয়ার কারণে থিও হয়তো তার চেনা ধার ও আন্তর্জাতিক ফুটবলের তীব্রতা হারিয়ে ফেলবেন।

কিন্তু সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ সিজনে আল হিলালের হয়ে তিনি ডিফেন্স সামলানোর পাশাপাশি আক্রমণভাগে নেইমার, আলেকসান্ডার মিত্রোভিচদের সাথে দুর্দান্ত রসায়ন গড়ে তোলেন। সদ্য সমাপ্ত সিজনে ডিফেন্ডার হয়েও তিনি ৯টি গোল এবং ৫টি অ্যাসিস্ট করেছেন। আল হিলালের হাই-ইনটেনসিটি গেমপ্লে এবং আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থিও-কে শারীরিকভাবে আরও শক্তিশালী ও ফিট করে তুলেছে, যা জাতীয় দলের কোচ দিদিয়ের দেশমকে আশ্বস্ত করেছে।

আল হিলাল এর জার্সিতে থিও হার্নান্দেজ – Image Source: alhilal.com

থিও হার্নান্দেজের শৈশব ও বেড়ে ওঠা স্পেনে হওয়ায় তার সামনে স্পেনের জাতীয় দলের হয়ে খেলার চমৎকার সুযোগ ছিল। এক সময় স্প্যানিশ নাগরিকত্ব নিয়ে স্পেনের জার্সিতে তার খেলার গুঞ্জনও উঠেছিল। কিন্তু থিও সবসময়ই মনে-প্রাণে ফ্রান্সকে ভালোবাসতেন। অবশেষে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে উয়েফা নেশনস লিগের ম্যাচে ফরাসি জাতীয় দলের হয়ে তার আন্তর্জাতিক অভিষেক হয়। বেলজিয়ামের বিপক্ষে সেমিফাইনালে ম্যাচের শেষ মিনিটে তার করা দর্শনীয় গোলেই ফ্রান্স ৩-২ ব্যবধানে জয়ী হয়ে ফাইনালে উঠেছিল এবং পরবর্তীতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল।

তবে থিও হার্নান্দেজের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে নাটকীয় ও রূপকথার মতো অধ্যায়টি রচিত হয় ২০২২ ফিফা কাতার বিশ্বকাপে। ফ্রান্সের প্রথম ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে শুরুর একাদশে ছিলেন থিও-র বড় ভাই লুকাস হার্নান্দেজ। কিন্তু ম্যাচের মাত্র ১৩ মিনিটের মাথায় লুকাস গুরুতর এসিএল ইনজুরিতে পড়ে পুরো বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যান। ডাগআউট থেকে ভাইয়ের এই ট্র্যাজেডি দেখে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নামেন ছোট ভাই থিও।

থিও মাঠে নামার পর ফ্রান্সের লেফট-ব্যাক পজিশনে গতির ঝড় তোলেন। পুরো টুর্নামেন্টে এমবাপ্পের সাথে তার বোঝাপড়া ছিল দেখার মতো। বিশেষ করে সেমিফাইনালে মরক্কোর কঠিন ডিফেন্স ভেঙে মাত্র ৫ মিনিটের মাথায় তার করা অ্যাক্রোবেটিক গোলটি ফ্রান্সকে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে নিয়ে যায়। ফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে পেনাল্টি শুটআউটে হারলেও, থিও নিজেকে বিশ্বমঞ্চের অন্যতম সেরা লেফট-ব্যাক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।

২০২২ কাতার বিশ্বকাপে থিও হার্নান্দেজ– Image Source: news18.com

২০২২ কাতার বিশ্বকাপে ফ্রান্সের লেফট-ব্যাক পজিশনে আলো ছড়ানো থিও হার্নান্দেজ এবারও কোচ দিদিয়ের দেশমের ঘোষিত ২৬ সদস্যের ২০২৬ বিশ্বকাপ স্কোয়াডে জায়গা করে নিয়েছেন। মাঠের বাম প্রান্তে অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পের ঠিক পেছনে খেলবেন থিও। এমবাপ্পে যখন উইং ছেড়ে ভেতরের দিকে ঢুকবেন, থিও তার অবিশ্বাস্য গতি দিয়ে ওভারল্যাপ করে প্রতিপক্ষের ডিফেন্স ভেঙে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করবেন। ফ্রান্সের আক্রমণের অন্যতম মূল শক্তি এই জুটি।

গত বিশ্বকাপে ট্র্যাজেডির শিকার হওয়া থিও-র বড় ভাই লুকাস হার্নান্দেজও এবার ইনজুরি কাটিয়ে স্কোয়াডে ফিরেছেন। ফলে ২০২৬ বিশ্বকাপে ফরাসি ড্রেসিংরুমে এই দুই ভাইয়ের একসাথে উপস্থিতি দলের রক্ষণভাগকে মানসিকভাবে অনেক চাঙ্গা রাখছে।

২০২২-এর রানার্স-আপ মেডেলের আক্ষেপ ভুলে থিও কি এবার ফ্রান্সকে ট্রফি এনে দিতে পারবেন বলে আপনার মনে হয়?

Reference:

Related posts

মার্কোস আকুনা: কেন সবাই তাকে “ডিম” বলে ডাকে?

ব্রাজিলের রক্ষণের ‘লড়াকু সৈনিক’ রজার ইবানেজ

দ্য রেড মাওলানা-আবদুল হামিদ খান ভাসানী

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More