Image default
ক্রীড়াবিদজীবনীফুটবল

গ্যাব্রিয়েল মাগালাইস: ব্রাজিলের রক্ষণদুর্গ থেকে আর্সেনালের তারকা ডিফেন্ডার

মাঠে স্ট্রাইকারদের পকেটে পুরে ঘরে ফিরেই গাব্রিয়েল টিভিতে নিজের ‘ক্রাইম পেট্রোল’ দেখতে বসেন কোথায় কী ভুল করলেন তা তদন্ত করতে! 

১৯৯৭ সালের ১৯ ডিসেম্বর ব্রাজিলের সাও পাওলোতে জন্মগ্রহণ করেন গাব্রিয়েল দোস সান্তোস মাগালাইস। শৈশব থেকেই ফুটবলের প্রতি তার ছিল তীব্র টান। ব্রাজিলের আর দশটা সাধারণ ছেলের মতো তারও স্বপ্ন ছিল একদিন সেলেসাওদের বিখ্যাত হলুদ জার্সি গায়ে জড়ানো।

সান্তোস মাগালাইস- এর ব্যক্তিগত তথ্য:

নাম

গ্যাব্রিয়েল দোস সান্তোস মাগালাইস

জন্ম

১৯ ডিসেম্বর ১৯৯৭ (বয়স ২৮)

জন্মস্থান

সাও পাওলো, ব্রাজিল

উচ্চতা

১.৯০ মি (৬ ফুট ৩ ইঞ্চি)

পজিশন

সেন্টার-ব্যাক

ক্লাব ক্যারিয়ার

আভাই এফসি,লিঁল,ট্রয়েস,ডায়নামো জাগরেব এবং বর্তমানে আর্সেনাল ক্লাবের হয়ে খেলছেন।

আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার

২০২৩– ব্রাজিল

সান্তোস মাগালাইসের পেশাদার ফুটবল ক্যারিয়ার শুরু হয় দক্ষিণ ব্রাজিলের ক্লাব আভাইয়ের হয়ে। শুরুতে একাডেমি পর্যায়ে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখার পর ২০১৬ সালে আভাইয়ের মূল দলে তার অভিষেক হয়। মাত্র ১৮ বছর বয়সে ব্রাজিলের দ্বিতীয় স্তরের লিগে দলকে প্রথম স্তরে উন্নীত করতে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এই তরুণ তুর্কি। তার দীর্ঘকায় শরীর, দুর্দান্ত গতি এবং বাম পায়ের দারুণ নিয়ন্ত্রণ ইউরোপের বড় বড় স্কাউটদের নজর কাড়তে বেশি সময় নেয়নি।

আভাইয়ের জার্সিতে গাব্রিয়েল মাগালাইস – Image Source: telegraph.co.uk

২০১৭ সালের জানুয়ারিতে ফরাসি লিগ ওয়ানের ক্লাব লিঁল মাত্র ৩ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে গাব্রিয়েলকে দলে ভেড়ায়। তবে ইউরোপীয় ফুটবলের গতি ও ট্যাকটিক্সের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে শুরুতেই তাকে বেশ কিছুটা অগ্নিপরীক্ষা দিতে হয়েছিল।

শুরুর দিকে অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য সান্তোস মাগালাইসকে ট্রয়েস এবং ক্রোয়েশিয়ার ক্লাব ডায়নামো জাগরেবের বি দলে লোনে পাঠানো হয়। এই কঠিন সময়গুলো তার মানসিক শক্তি এবং ফুটবলীয় পরিপক্বতা অনেক বাড়িয়ে দিয়েছিল। ২০১৯ সালের দিকে লিলের মূল দলে নিয়মিত সুযোগ পেতে শুরু করেন তিনি। তৎকালীন কোচ ক্রিস্তফ গালতিয়ের অধীনে জোসে ফন্তের মতো অভিজ্ঞ ডিফেন্ডারের পাশে জুটি বেঁধে গাব্রিয়েল ফরাসি লিগের অন্যতম সেরা তরুণ ডিফেন্ডারে পরিণত হন। ২০১৯-২০ মৌসুমে লিগ ওয়ানে প্রতিপক্ষের অর্ধে সবচেয়ে বেশি সফল পাস দেওয়ার রেকর্ড গড়েন তিনি, যা তার দারুণ পাসিং রেঞ্জের প্রমাণ দেয়।

২০২০ সালের গ্রীষ্মকালীন দলবদলে ইউরোপের অনেক বড় বড় ক্লাব গাব্রিয়েল মাগালাইসকে দলে নেওয়ার জন্য প্রতিযোগিতায় নামে। বিশেষ করে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, এভারটন এবং নাপোলি তাকে নেওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। তবে তৎকালীন আর্সেনাল ম্যানেজার মিকেল আর্তেতার দূরদর্শী প্রজেক্টের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তিনি ২৭ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে লন্ডনের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব গানার্সদের বেছে নেন।

উত্তেজনাপূর্ণ ডার্বিতে স্পার্সের বিপক্ষে গ্যাব্রিয়েলের হেড– Image Source: assets-api.kathmandupost.com

১২ সেপ্টেম্বর ২০২০-এ ফুলহামের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে আর্সেনালের জার্সিতে তার অভিষেক ঘটে। অভিষেক ম্যাচেই দুর্দান্ত এক হেডে গোল করে এবং ক্লিনশিট রেখে তিনি ভক্তদের মন জয় করে নেন। মিকেল আর্তেতা প্রথম থেকেই বুঝতে পেরেছিলেন যে আর্সেনালের নড়বড়ে ডিফেন্সকে ঠিক করতে হলে গাব্রিয়েলের মতো একজন ‘ফিজিক্যাল’ অথচ আধুনিক ডিফেন্ডার অত্যন্ত জরুরি ছিল।

আর্সেনালের পুনরুত্থানের পেছনে সবচেয়ে বড় শক্তির নাম তাদের রক্ষণভাগ, যার মূল ভিত্তি হলো ফরাসি ডিফেন্ডার উইলিয়াম সালিবা এবং গাব্রিয়েল মাগালাইসের জমাট পার্টনারশিপ। ফুটবল বিশ্বে এই জুটিকে বর্তমান সময়ের অন্যতম সেরা এবং ভারসাম্যপূর্ণ সেন্টার-ব্যাক জুটি হিসেবে গণ্য করা হয়।

গাব্রিয়েল মাগালাইসকে অন্য সাধারণ ডিফেন্ডারদের থেকে যা আলাদা করে, তা হলো গোলমুখে তার অবিশ্বাস্য কার্যকারিতা। তিনি কেবল গোল হজম করা থেকেই দলকে বাঁচান না, বরং কর্নার বা ফ্রি-কিক থেকে নিয়মিত গোল করে দলকে মূল্যবান ৩ পয়েন্ট এনে দেন।

২০২৩ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত সময়কালকে গাব্রিয়েল মাগালাইসের ক্যারিয়ারের স্বর্ণযুগ বলা যেতে পারে। এই সময়ে তিনি নিজের পারফরম্যান্সকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। ২০২৫-২৬ মৌসুমে আর্সেনালের ডিফেন্স পুরো লিগে মাত্র ২৭টি গোল হজম করে, যা ছিল পুরো টুর্নামেন্টের সর্বনিম্ন। এই রক্ষণাত্মক দৃঢ়তার মূল কারিগর ছিলেন গাব্রিয়েল।

সম্প্রতি ২০২৫-২৬ মৌসুমের শেষে ম্যানচেস্টার সিটি এবং লিভারপুলের নামী তারকাদের পেছনে ফেলে তিনি প্রিমিয়ার লিগের “ডিফেন্ডার অব দ্য সিজন”নির্বাচিত হয়েছেন। এই মৌসুমে তিনি রক্ষণ সামলানোর পাশাপাশি লিগে ৩টি গোল এবং ৪টি অ্যাসিস্ট করেন। বিশেষ করে নিউক্যাসল ইউনাইটেডের বিপক্ষে ম্যাচের ৯৫ মিনিটে তার করা নাটকীয় জয়সূচক গোলটি আর্সেনাল ভক্তদের মনে দীর্ঘকাল দাগ কেটে থাকবে।

২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বলিভিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে ব্রাজিলের জাতীয় দলে গাব্রিয়েল মাগালাইসের অভিষেক ঘটে। ব্রাজিল জাতীয় দলে সেন্টার-ব্যাক পজিশনে মারকুইনহোস, থিয়াগো সিলভা বা এদের মিলিতাওদের মতো বিশ্বমানের তারকাদের সাথে প্রতিযোগিতা করে তাকে দলে জায়গা করে নিতে হয়েছে।

গাব্রিয়েল মাগালাইস গোল উল্লাস – Image Source: arsenal

বর্তমানে তিনি ব্রাজিলের রক্ষণভাগের অন্যতম নিয়মিত মুখ। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ব্রাজিলের হয়ে তিনি তার প্রথম আন্তর্জাতিক গোলটিও করেন। থিয়াগো সিলভার বিদায়ের পর ব্রাজিলের ডিফেন্সে যে নেতৃত্বের অভাব ছিল, তা পূরণে সবচেয়ে বড় ভরসার নাম গাব্রিয়েল মাগালাইস। ২০২৬ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের রক্ষণভাগকে টেনে তোলার মূল দায়িত্ব থাকবে এই আর্সেনাল তারকার কাঁধেই। 

পিএসজির অভিজ্ঞ মারকুইনহোসের পাশে গাব্রিয়েলের আগ্রাসী ডিফেন্ডিং শৈলী ব্রাজিলকে বিশ্বকাপে এক দুর্ভেদ্য দেওয়াল উপহার দিতে যাচ্ছে। লাতিন নান্দনিকতার পাশাপাশি ইউরোপিয়ান ঘরানার ফিজিক্যাল ফুটবলের যে মিশ্রণ গাব্রিয়েলের মধ্যে আছে, তা বিশ্বকাপের বিশ্বসেরা স্ট্রাইকারদের আটকানোর জন্য ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। 

গ্যাব্রিয়েলের ছোট পরিবার – Image Source: metro.co.uk

মাঠের বাইরে গাব্রিয়েল একজন শান্ত এবং পরিবারকেন্দ্রিক মানুষ। ২০২৩ সালের জুনে তিনি তার দীর্ঘদিনের সঙ্গী গ্যাব্রিয়েল ফিগুইরেদোকে বিয়ে করেন। তাদের ঘরে মায়া নামের একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। শৈশব থেকেই গাব্রিয়েল ব্রাজিলের বিখ্যাত ক্লাব করিন্থিয়ান্সের (Corinthians) অন্ধ ভক্ত। তিনি প্রায়ই ছুটির দিনে ব্রাজিলে গিয়ে গ্যালারিতে বসে করিন্থিয়ান্সের ম্যাচ উপভোগ করেন এবং ভবিষ্যতে ক্যারিয়ারের শেষভাগে এই ক্লাবের হয়ে খেলার ইচ্ছার কথা ব্যক্ত করেছেন।

Reference:

Related posts

আলিসন বেকার: ড্রেসিংরুমের রকস্টার, মাঠের সুপারহিরো

দানিলো: ২০২৬ বিশ্বকাপে সেলেসাওদের হেক্সা মিশনের আসল কাণ্ডারি

আশা রহমান

কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে মন্ত্রিত্ব: কে এই আসিফ মাহমুদ?

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More