আপনি কি জানেন, বায়ার্ন মিউনিখ এবং জার্মানি দল বছরের পর বছর ধরে মাঠে ১১ জন ‘আউটফিল্ড’ খেলোয়াড় নিয়ে খেলত? না, কোনো নিয়ম ভেঙে নয়! আসলে তাদের গোলপোস্টের নিচে এমন একজন মানুষ দাঁড়িয়ে থাকতেন, যার কাছে গোললাইনের ভেতর হাত দিয়ে বল ঠেকানোর চেয়ে বক্সের বাইরে এসে পায়ে বল নিয়ে কারসাজি করাটা বেশি আনন্দের ছিল। তিনি ম্যানুয়েল নয়ার। নয়ার কেবল একজন গোলরক্ষক নন; তিনি আধুনিক ফুটবলের ‘সুইপার-কিপার’ ধারণার জনক এবং পুর্নবিকাশকারী। ফুটবল বিশ্বের এই অনন্য ‘সুইপার-কিপার’ গোলপোস্টের খাঁচা ভেঙে ফুটবলকে কীভাবে বদলে দিয়েছেন, চলুন জানা যাক।
ম্যানুয়েল নয়ার- এর ব্যক্তিগত তথ্য:
| নাম |
ম্যানুয়েল পিটার নয়ার |
|
জন্ম |
২৭ মার্চ ১৯৮৬ (বয়স ৪০) |
|
জন্মস্থান |
গেলসেনকির্খেন , পশ্চিম জার্মানি |
|
উচ্চতা |
১.৯৩ মিটার (৬ ফুট ৪ ইঞ্চি) |
|
পজিশন |
গোলরক্ষক |
|
ক্লাব ক্যারিয়ার |
শালকে ০৪ এবং বর্তমানে বায়ার্ন মিউনিখ ক্লাবের হয়ে খেলছেন। |
|
আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার |
২০০৯-জার্মানি |

ম্যানুয়েল পিটার নয়ার ১৯৮৬ সালের ২৭ মার্চ তৎকালীন পশ্চিম জার্মানির গেলসেনকির্খেনে জন্মগ্রহণ করেন। ফুটবলের হাতেখড়ি হয় তার নিজ শহরের ক্লাব শালকে ০৪-এর যুব একাডেমি ‘কানেরা’-তে। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তিনি শালকের একাডেমিতে যোগ দেন। মজার ব্যাপার হলো, তার প্রথম ম্যাচেই তিনি গোলপোস্টের নিচে দাঁড়াতে বাধ্য হন কারণ দলে কোনো নিয়মিত গোলকিপার ছিল না। সেই শুরু, এরপর আর কখনো তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
২০০৫ সালে শালকের মূল দলে সুযোগ পাওয়ার পর ২০০৬/০৭ মৌসুমে ২০ বছর বয়সী নয়ার দলের এক নম্বর গোলরক্ষক হয়ে ওঠেন। সেই মৌসুমেই বায়ার্ন মিউনিখের বিপক্ষে এক ম্যাচে ম্যানুয়েল নয়ার অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স করে জার্মানি জুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেন।

২০১০ সালের ফিফা বিশ্বকাপের ঠিক আগে জার্মানির প্রধান গোলরক্ষক রেনে অ্যাডলার ইনজুরিতে পড়লে ২৪ বছর বয়সী ম্যানুয়েল নয়ারকে জার্মানির এক নম্বর জার্সি দেওয়া হয়। দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে নয়ারের পারফরম্যান্স ছিল চোখধাঁধানো। বিশেষ করে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে রাউন্ড অফ ১৬-এর ম্যাচে মিরোস্লাভ ক্লোসার গোলের জন্য নয়ারের দেওয়া দূরপাল্লার অ্যাসিস্টটি ছিল তার ভবিষ্যৎ ‘প্লে-মেকিং’ দক্ষতার প্রথম আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী।
২০১০/১১ মৌসুমে শালকে ০৪-এর অধিনায়ক হিসেবে ম্যানুয়েল নয়ার ক্লাবটিকে উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের সেমিফাইনালে নিয়ে যান। কোয়ার্টার ফাইনালে ইন্টার মিলান এবং সেমিফাইনালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে নয়ার যে মানের গোলকিপিং প্রদর্শন করেছিলেন, তা দেখে স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে তাকে ওল্ড ট্রাফোর্ডে নিয়ে আসার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু নয়ারের ভাগ্য আগে থেকেই জার্মানির সবচেয়ে বড় ক্লাবের সাথে লেখা ছিল।

২০১১ সালের জুনে ম্যানুয়েল নয়ার ২২ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে বায়ার্ন মিউনিখে যোগ দেন, যা তৎকালীন সময়ে তাকে ইতিহাসের অন্যতম ব্যয়বহুল গোলরক্ষকে পরিণত করে। শালকে থেকে বায়ার্নে আসার কারণে শুরুতে বায়ার্নের উগ্র সমর্থকরা তাকে মেনে নিতে পারেনি। কিন্তু নয়ার মাঠের পারফরম্যান্স দিয়ে খুব দ্রুতই মিউনিখ ভক্তদের মন জয় করে নেন। বায়ার্নে যোগ দেওয়ার প্রথম মৌসুমেই তিনি টানা ১,১৪৭ মিনিট কোনো গোল না খেয়ে ওলিভার কানের ক্লাব রেকর্ড ভেঙে দেন।
২০১২ সালের উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে চেলসির কাছে টাইব্রেকারে হারার পর ২০১৩ সালে বায়ার্ন মিউনিখ এক ক্ষুধার্ত নেকড়ের মতো ফিরে আসে। বায়ার্ন মিউনিখ সেই মৌসুমে বুন্দেসলিগা, ডিএফবি-পোকাল এবং উইম্বলিতে বরুশিয়া ডর্টমুন্ডকে হারিয়ে উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতে ঐতিহাসিক ট্রেবল জয় করে। পুরো টুর্নামেন্টে ম্যানুয়েল নয়ার বায়ার্নের ডিফেন্সের পেছনে এক অদৃশ্য দেয়াল হয়ে ছিলেন।

ফিলিপ লামের অবসরের পর ম্যানুয়েল নয়ার বায়ার্ন মিউনিখের প্রধান অধিনায়ক নির্বাচিত হন। ২০১৯/২০ মৌসুমে হান্সি ফ্লিকের অধীনে বায়ার্ন মিউনিখ যখন ইউরোপের দলগুলোকে একের পর এক গোলবন্যায় ভাসাচ্ছিল, তখন নয়ার ডিফেন্সের শেষ প্রহরী হিসেবে নেতৃত্ব দেন। পিএসজির বিপক্ষে ফাইনালে নেইমার ও কিলিয়ান এমবাপের নিশ্চিত কিছু শট আটকে দিয়ে নয়ার বায়ার্নকে তাদের ইতিহাসের দ্বিতীয় ট্রেবল এনে দেন এবং উয়েফা বর্ষসেরা গোলরক্ষকের পুরস্কার জেতেন।
ম্যানুয়েল নয়ারকে কেন ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী গোলরক্ষক বলা হয়? কারণ তিনি গোলকিপিংয়ের ব্যাকরণ পুনর্লিখন করেছেন। পেপ গার্দিওলা যখন ২০১৩ সালে বায়ার্ন মিউনিখের কোচ হয়ে আসেন, তখন তিনি নয়ারের পায়ের কাজে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে রসিকতা করে বলেছিলেন, “নয়ার চাইলে বুন্দেসলিগায় মিডফিল্ডার হিসেবেও খেলতে পারে।”
ম্যানুয়েল নয়ারের ক্যারিয়ারের পরম গৌরবময় অধ্যায়টি রচিত হয় ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপে। জোয়াকিম লো-এর জার্মানি দলের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি ছিলেন নয়ার। বিশেষ করে আলজেরিয়ার বিপক্ষে রাউন্ড অফ ১৬-এর ম্যাচটি ফুটবল ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

সেই ম্যাচে জার্মানির ডিফেন্স লাইন আলজেরিয়ার গতির কাছে বারবার পরাস্ত হচ্ছিল। কিন্তু নয়ার পুরো ম্যাচে গোললাইনের চেয়ে পেনাল্টি বক্সের বাইরেই বেশি সময় কাটান। তিনি ডিফেন্ডারদের পজিশনে গিয়ে স্লাইডিং ট্যাকল ও হেড করে অন্তত ৪টি নিশ্চিত গোল রক্ষা করেন। ম্যাচ শেষে ধারাভাষ্যকাররা বলেছিলেন, “জার্মানি আজ মাঠে কোনো গোলকিপার নিয়ে খেলেনি, তারা একজন বিশ্বমানের সুইপার নিয়ে খেলেছে।”
ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে গঞ্জালো হিগুয়েন, লিওনেল মেসি এবং রদ্রিগো পালাসিওদের আক্রমণগুলো ম্যানুয়েল নয়ার অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় নসাৎ করেন। পুরো টুর্নামেন্টে অসাধারণ পারফরম্যান্সের জন্য তাকে বিশ্বকাপের সেরা গোলরক্ষক হিসেবে ‘গোল্ডেন গ্লাভস’ প্রদান করা হয়।

২০১৪ বিশ্বকাপে বিশ্বজয়ের পর ম্যানুয়েল নয়ার ফুটবল বিশ্বের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত পুরস্কার ‘ব্যালন ডি’অর’-এর চূড়ান্ত তিন জনের তালিকায় স্থান পান। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো এবং লিওনেল মেসির মতো দুই মহাতারকার যুগে একজন গোলরক্ষক হিসেবে তৃতীয় হওয়া নয়ারের ফুটবলীয় প্রভাবের সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
একজন খেলোয়াড়ের শ্রেষ্ঠত্ব কেবল তার জয়ে নয়, বরং পতনের পর তার ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতার মধ্যেও প্রকাশ পায়। ২০১৭ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে নয়ারের ক্যারিয়ারে এক অন্ধকার সময় নেমে আসে। তার বাঁ-পায়ের মেটাটারসাল বোন বারবার ভেঙে যাওয়ার কারণে তিনি প্রায় দুই বছর ফুটবলের বাইরে ছিলেন। অনেকেই ভেবেছিলেন নয়ারের ক্যারিয়ার হয়তো এখানেই শেষ।
কিন্তু ম্যানুয়েল নয়ার অবিশ্বাস্য মানসিক শক্তি নিয়ে মাঠে ফেরেন। ২০২০ সালে বায়ার্নকে ট্রেবল জিতিয়ে তিনি প্রমাণ করেন যে কেন তিনি সেরা। ২০২২ সালের বিশ্বকাপের পর স্কিইং করতে গিয়ে নয়ারের পা আবার ভেঙে যায়, যা তার ক্যারিয়ারকে আবারও হুমকির মুখে ফেলেছিল। কিন্তু ২০২৪ সালে তিনি আবারও বায়ার্ন এবং জার্মানির ১ নম্বর জার্সি ফিরে পান এবং উয়েফা ইউরো ২০২৪-এ জার্মানির হয়ে অসাধারণ কিছু ম্যাচ খেলেন।

২০২৪ সালের ইউরো কাপের পর তিনি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপের আগে গোলরক্ষক মার্ক-আন্দ্রে টের স্টেগেনের গুরুতর ইনজুরির কারণে এবং কোচ হুলিয়ান নাগেলসম্যানের বিশেষ অনুরোধে নয়ার আবারও জার্মানির জার্সিতে মাঠে নামার সিদ্ধান্ত নেন। এই বিশ্বকাপে খেলার মাধ্যমে নয়ার তার ক্যারিয়ারের ৫ম বিশ্বকাপ খেলছেন।
ফুটবল পাড়ায় এখন রসিকতা চলছে “নয়ারের অবসর নেওয়া আর মার্ভেল সিনেমার সুপারহিরোদের বিদায় নেওয়া একই কথা; দরকারে তারা ঠিকই পিপিই পরে আবার দুনিয়া বাঁচাতে হাজির হয়ে যান!”
ম্যানুয়েল নয়ারের কিছু আকর্ষণীয় ও অজানা তথ্য
‘হু ওয়ান্টস টু বি এ মিলিয়নিয়ার’ বিজয়ী!
নয়ার শুধু মাঠেই বুদ্ধিমান নন, মাঠের বাইরেও তার সাধারণ জ্ঞান অসাধারণ। ২০১১ সালে তিনি জার্মানির বিখ্যাত কুইজ শো “Wer wird Millionär?” (যা আমাদের অঞ্চলের ‘কে হতে চায় কোটিপতি’র মতো)-তে অংশ নেন। সেখানে তিনি বুদ্ধিমত্তার সাথে সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে ৫,০০,০০০ ইউরো জিতে নেন! জয়ের পুরো টাকাটাই তিনি তার নিজস্ব চ্যারিটি ফান্ড ‘ম্যানুয়েল নয়ার কিডস ফাউন্ডেশন’-এ দান করে দেন।
হলিউড সিনেমায় নয়ারের কণ্ঠ!
ফুটবলার নয়ার যে একজন ডাবিং আর্টিস্টও, তা অনেকেই জানেন না! ২০১৩ সালের বিখ্যাত অ্যানিমেটেড সিনেমা মনস্টার্স ইউনিভার্সিটির জার্মান সংস্করণে একটি চরিত্রের জন্য কণ্ঠ দিয়েছিলেন নয়ার। ‘ফ্রাঙ্ক ম্যাককে’ নামের একটি বড় লাল দানবীয় চরিত্রের ডাবিং করেছিলেন তিনি।
পেপ গার্দিওলা তাকে ‘মিডফিল্ডার’ বানাতে চেয়েছিলেন
বায়ার্ন মিউনিখে খেলার সময় নয়ারের পায়ের কাজ এবং পাসিং নিখুঁত দেখে তৎকালীন কোচ পেপ গার্দিওলা এক অদ্ভুত আইডিয়া বের করেছিলেন। গার্দিওলা গুরুত্বসহকারেই বায়ার্ন বোর্ডের কাছে প্রস্তাব রেখেছিলেন, যেন বুন্দেসলিগার কোনো একটি ম্যাচে নয়ারকে গোলপোস্ট থেকে বের করে সরাসরি মিডফিল্ডার হিসেবে খেলানো হয়! তবে ক্লাবের অন্যান্য কর্তারা ঝুঁকি নিতে চাননি বলে গার্দিওলাকে থামানো হয়েছিল।
প্রথম ম্যাচেই গোলকিপার হতে বাধ্য হওয়া
মাত্র ৫ বছর বয়সে শালকে ০৪-এর একাডেমিতে যখন নয়ারের প্রথম ম্যাচ ছিল, তখন তিনি আসলে আউটফিল্ড খেলোয়াড় হিসেবেই খেলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু দলের নিয়মিত গোলকিপার সেদিন না আসায় কোচ নয়ারকে গোলপোস্টে দাঁড় করিয়ে দেন। মাঠের মাটি তখন কাদায় ভরা ছিল, তাই ছোট নয়ারের যাতে চোট না লাগে, সেজন্য তাকে এক জোড়া পুরনো গ্লাভস আর টেডি বিয়ারের মতো নরম সোয়েটার পরিয়ে দেওয়া হয়েছিল!
নিজের ‘মোমের মূর্তি’র সাথে নিজেই বিভ্রান্ত!
২০১৫ সালে বার্লিনের বিখ্যাত মাদাম তুসো জাদুঘরে ম্যানুয়েল নয়ারের একটি মোমের মূর্তি উন্মোচন করা হয়। মূর্তিটি এতটাই নিখুঁত ছিল যে, উদ্বোধনের দিন নয়ার নিজেই তার মূর্তির পাশে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে যান। তিনি হেসে বলেছিলেন, “আমার মোমের চোখের চাহনি হুবহু আসল নয়ারের মতোই তীক্ষ্ণ, মাঠে স্ট্রাইকাররা আমাকে যেভাবে দেখে!”

এক ম্যাচে দুই জার্সির অবিশ্বাস্য ট্রিবিউট
নয়ার যখন শালকে ০৪ ছেড়ে বায়ার্ন মিউনিখে যোগ দেন, তখন শালকের উগ্র সমর্থকরা তাকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলে গালি দিয়েছিল। কিন্তু ২০১১ সালের মে মাসে শালকের হয়ে নিজের শেষ ম্যাচে নয়ার এক আবেগঘন কাণ্ড করেন। ম্যাচের প্রথমার্ধে শালকের জার্সি পরে খেললেও, ম্যাচ শেষে তিনি মাঠ ছাড়ার সময় বায়ার্নের জার্সি গায়ে জড়িয়ে শালকের গ্যালারির দিকে হাত নেড়ে বিদায় নেন যা ফুটবল ইতিহাসে এক বিরল দৃশ্য।
Reference:

