Image default
ক্রীড়াবিদজীবনীফুটবল

ক্রিকেট পিচ থেকে ফুটবল মাঠ: ডিন হেন্ডারসনের গল্প

শৈশবে ডিন হেন্ডারসন ফুটবলের পাশাপাশি কাম্ব্রিয়া কাউন্টির হয়ে দুর্দান্ত ক্রিকেট খেলতেন। তিনি মূলত একজন ভালো ব্যাটসম্যান ও উইকেটকিপার ছিলেন, তবে ১৪ বছর বয়সে ক্রিকেটের মায়া ছেড়ে ফুটবল মাঠকেই নিজের ক্যারিয়ার হিসেবে বেছে নেন। 

ডিন হেন্ডারসন এমন একজন গোলকিপার, যিনি মুখে যা ভাবেন, মিডিয়ার সামনেও তা সরাসরি বলতে দ্বিধা করেন না। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বেঞ্চে বসে ক্যারিয়ার নষ্ট করার চেয়ে ছোট ক্লাবে গিয়ে নিজেকে প্রমাণ করার যে কঠিন চ্যালেঞ্জ তিনি নিয়েছেন, তা প্রিমিয়ার লিগে খুব কম খেলোয়াড়ই করতে পারেন। শেফিল্ড ইউনাইটেডকে একা হাতে প্রিমিয়ার লিগে টিকিয়ে রাখা এবং বর্তমানে ক্রিস্টাল প্যালেসের ড্রেসিংরুমের আসল নেতা এই ঠোঁটকাটা অথচ বিশ্বমানের গোলকিপারকে নিয়ে আজকের এই বিশেষ আয়োজন।

ডিন হেন্ডারসন-এর ব্যক্তিগত তথ্য:

নাম

ডিন ব্র্যাডলি হেন্ডারসন

জন্ম

১২ মার্চ ১৯৯৭ (বয়স ২৯)

জন্মস্থান

হোয়াইটহেভেন , কামব্রিয়া, ইংল্যান্ড

উচ্চতা

৬ ফুট ২ ইঞ্চি (১.৮৮ মিটার)

পজিশন

গোলরক্ষক

ক্লাব ক্যারিয়ার

ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড,স্টকপোর্ট কাউন্টি,গ্রিমসবি টাউন,শ্রুসবারি টাউন,শেফিল্ড ইউনাইটেড,নটিংহাম ফরেস্ট এবং বর্তমানে ক্রিস্টাল প্যালেস ক্লাবের হয়ে খেলছেন।

আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার

২০২০– ইংল্যান্ড

ডিন হেন্ডারসন – Image Source: talksport.com

১৯৯৭ সালের ১২ মার্চ ইংল্যান্ডের হোয়াইটহ্যাভেনে জন্মগ্রহণ করেন ডিন ব্রাডলি হেন্ডারসন। শৈশবে তিনি কেবল ফুটবল খেলতেন না, কাউন্টি স্তরে দুর্দান্ত ক্রিকেটও খেলতেন। তবে শেষ পর্যন্ত ফুটবলের প্রতি টানই তাকে টেনে নিয়ে যায়। মাত্র ১৪ বছর বয়সে ২০১১ সালে তিনি ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিখ্যাত যুব একাডেমিতে যোগ দেন।

ইউনাইটেডের একাডেমিতে হেন্ডারসনের প্রতিভা নিয়ে কারও কোনো সন্দেহ ছিল না। তবে মূল দলের গোলপোস্টে তখন রাজত্ব করছিলেন বিশ্বসেরা দাভিদ দে হেয়া। ফলে তরুণ হেন্ডারসনকে প্রথম দলের অভিজ্ঞতার জন্য লোয়ার লিগের কঠিন স্কুলগুলোতে পাঠাতে শুরু করে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। স্টকপোর্ট কাউন্টি, গ্রিমসবি টাউন এবং শ্রুসবারি টাউনে লোনে খেলার সময় হেন্ডারসন প্রমাণ করেন যে তিনি সাধারণ কোনো কিপার নন। বিশেষ করে ২০১৭-১৮ মৌসুমে শ্রুসবারিকে লিগ ওয়ানের প্লে-অফ ফাইনালে তোলার পর তিনি ফুটবল মহলে দারুণ প্রশংসিত হন।

ডিন হেন্ডারসনের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সোনালী এবং বৈপ্লবিক অধ্যায়টি আসে শেফিল্ড ইউনাইটেডে। ২০১৮ সালে তিনি ধারে চ্যাম্পিয়নশিপের দল শেফিল্ডে যোগ দেন।

প্রথম মৌসুমেই তিনি ক্লাবের হয়ে ২১টি ক্লিন শিট রেখে দলকে প্রিমিয়ার লিগে উন্নীত করেন। এরপর ২০১৯-২০ মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগে এসে শেফিল্ডের মতো ছোট দলকে নিয়ে তিনি যা করেছিলেন, তা এক কথায় অবিশ্বাস্য। সেই মৌসুমে হেন্ডারসন লিগে ১৩টি ক্লিন শিট রেখে লিভারপুলের আলিসন বা সিটির এদেরসনের মতো কিপারদের সাথে টক্কর দেন। চিতার মতো রিফ্লেক্স এবং বক্সে ডিফেন্ডারদের কমান্ড করার ক্ষমতার কারণে তিনি প্রিমিয়ার লিগের অন্যতম সেরা তরুণ গোলকিপার হিসেবে স্বীকৃতি পান।

শেফিল্ডে দুই মৌসুমের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর ২০২০ সালে ডিন হেন্ডারসন বুক ভরা আত্মবিশ্বাস নিয়ে ওল্ড ট্রাফোর্ডে ফেরেন। তার লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট দাভিদ দে হেয়াকে সরিয়ে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের এক নম্বর কিপার হওয়া। ২০২০-২১ মৌসুমে তিনি দে হেয়াকে বেঞ্চে বসিয়ে বেশ কিছু ম্যাচে শুরুর একাদশে জায়গাও করে নেন। সেই মৌসুমে তিনি সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ২৬টি ম্যাচ খেলেন।

কিন্তু ২০২১-২২ মৌসুমের শুরুতে এক দুর্ভাগ্যজনক মোড় আসে। মৌসুম শুরুর ঠিক আগে ডিন হেন্ডারসন মারাত্মকভাবে কোভিডে আক্রান্ত হন এবং দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তিতে ভোগেন। এই সুযোগে দে হেয়া তার পুরনো ফর্ম ফিরে পান এবং দুর্দান্ত পারফর্ম করতে শুরু করেন। হেন্ডারসন পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার পরও পুরো মৌসুম বেঞ্চে বসে কাটাতে বাধ্য হন।

পরবর্তীতে ২০২২ সালে নটিংহাম ফরেস্টে লোনে গিয়ে তিনি আবার ভালো ফর্মে ফেরেন। তবে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ম্যানেজমেন্টের ওপর ক্ষোভ উগরে দিয়ে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ওল্ড ট্রাফোর্ডে তাকে এক নম্বর কিপার বানানোর মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে এক বছর বেঞ্চে বসিয়ে রাখা হয়েছিল, যা তার ক্যারিয়ারের বিশাল ক্ষতি করেছে। এই স্পষ্টভাষী এবং জেদি মনোভাবের কারণে শেষ পর্যন্ত ইউনাইটেডের সাথে তার সম্পর্কের ইতি ঘটে।

ডিন হেন্ডারসন এর অবিশ্বাস্য বল সেভ– Image Source: www.nbcnews.com

২০২৩ সালের আগস্টে প্রায় ২০ মিলিয়ন পাউন্ড ট্রান্সফার ফির বিনিময়ে স্থায়ী চুক্তিতে লণ্ডনের ক্লাব ক্রিস্টাল প্যালেসে যোগ দেন ডিন হেন্ডারসন। সেলহার্স্ট পার্কে এসে শুরুতেই ইনজুরির ধাক্কা সামলাতে হলেও, পরবর্তীতে তিনি স্যাম জনস্টনকে সরিয়ে ক্লাবের এক নম্বর কিপার হিসেবে নিজের জায়গা পাকা করেন।

সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ প্রিমিয়ার লিগ মৌসুমে ডিন হেন্ডারসন ক্রিস্টাল প্যালেসের ডিফেন্সের মূল মেরুদণ্ড ছিলেন। প্যালেসের কাউন্টার-অ্যাটাকিং স্টাইলে নিচ থেকে নিখুঁত লং-পাস দিয়ে আক্রমণ তৈরি করা এবং ওয়ান-অন-ওয়ান পরিস্থিতিতে দুর্দান্ত সব সেভ করে তিনি ক্লাবকে লিগ টেবিলের বেশ ভালো একটি অবস্থানে ধরে রাখতে সাহায্য করেছেন।

ইংল্যান্ডের বয়সভিত্তিক সব স্তরে খেলার পর ২০২০ সালের নভেম্বরে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ডিন হেন্ডারসনের জাতীয় দলে অভিষেক হয়। ২০২১ সালের ইউরো কাপের স্কোয়াডেও তিনি ছিলেন, কিন্তু ইনজুরির কারণে টুর্নামেন্টের মাঝপথেই ছিটকে যান।

ইংল্যান্ড জাতীয় দলের গোলপোস্টে জর্ডান পিকফোর্ড এক নম্বর পছন্দ হলেও, থ্রি লায়ন্সদের ড্রেসিংরুমে এবং বেঞ্চে যিনি পিকফোর্ডকে প্রতিনিয়ত সবচেয়ে বড় টেনশনে রাখছেন, তিনি হলেন ডিন হেন্ডারসন। ক্রিস্টাল প্যালেসের হয়ে প্রিমিয়ার লিগে দুর্দান্ত পারফর্ম করে হেন্ডারসন ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের ইংল্যান্ড স্কোয়াডে নিজের জায়গা অত্যন্ত শক্তভাবে পোক্ত করে নিয়েছেন।

ডিন হেন্ডারসন এবং জর্ডান পিকফোর্ড– Image Source: sports.yahoo.com

হেন্ডারসনের জন্য এই বিশ্বকাপটি কেবল একটি টুর্নামেন্ট নয়, বরং তার দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক লড়াইয়ের এক বড় স্বীকৃতি। ২০২১ সালের ইউরো কাপের স্কোয়াডে থেকেও ইনজুরির কারণে মাঝপথে টুর্নামেন্ট ছাড়ার যে ট্র্যাজেডি তার ক্যারিয়ারে ছিল, ২০২৬ সালের মেগা মঞ্চে এসে সেই আক্ষেপ অনেকটাই মিটেছে। ক্রিস্টাল প্যালেসের হয়ে লিগে দুর্দান্ত ওয়ান-অন-ওয়ান সেভ এবং পেনাল্টি আটকানোর যে আত্মবিশ্বাস তিনি দেখিয়েছেন, সেটাই তাকে ইংল্যান্ডের প্রধান ব্যাক-আপ কিপার হিসেবে কোচদের অন্যতম বড় ভরসায় পরিণত করেছে।

Reference:

Related posts

কোবি মাইনু: ঘানার প্রস্তাব ফিরিয়ে ইংল্যান্ডের মাঝমাঠের রাজা

admin

মাইক ম্যাগনান: ফুটবলের ‘ম্যাজিক মাইক’-এর উত্থানের গল্প

সেলেসাও মাঝমাঠের অভেদ্য দেওয়াল কাসেমিরো

আশা রহমান

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More