Image default
ক্রীড়াবিদজীবনীফুটবল

রিস জেমস: স্ট্যামফোর্ড ব্রিজের ফিনিক্স পাখি

জেমসের পরিবার ইংলিশ ফুটবলের অন্যতম সফল পরিবার। রিসের ছোট বোন লরেন জেমসও চেলসি নারী দল ও ইংল্যান্ড জাতীয় দলের এক দুর্দান্ত ফরোয়ার্ড। ফুটবল ইতিহাসে একই সাথে ভাই-বোনের একই ক্লাবে খেলা এবং দেশের প্রতিনিধিত্ব করার এমন নজির আসলেই বিরল। 

রিস জেমস চেলসির একাডেমির ৬ বছরের সেই ছোট্ট ছেলেটি থেকে আজ স্ট্যামফোর্ড ব্রিজের অবিসংবাদিত নেতা। আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সেরা এবং পরিপূর্ণ রাইট-ব্যাক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার পাশাপাশি ব্লুজদের আর্মব্যান্ড মাথায় তোলা এই তারকার ক্যারিয়ারের পথটা কিন্তু সহজ ছিল না। চেলসির চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের মহাকাব্য থেকে শুরু করে ইনজুরির অন্ধকার টানেল পেরিয়ে বারবার ফিনিক্স পাখির মতো ফিরে আসা এই ঘরের ছেলেকে নিয়েই আজকের এই বিশেষ আয়োজন। 

রিস জেমস’র ব্যক্তিগত তথ্য:

নাম

রিস লুইস জেমস

জন্ম

৮ ডিসেম্বর ১৯৯৯ (বয়স ২৬)

জন্মস্থান

রেডব্রিজ, লন্ডন , ইংল্যান্ড

উচ্চতা

৫ ফুট ১১ ইঞ্চি (১.৮০ মিটার)

পজিশন

রাইট ব্যাক 

ক্লাব ক্যারিয়ার

উইগান অ্যাথলেটিক এবং বর্তমানে চেলসি ক্লাবের হয়ে খেলছেন।

আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার

২০২০– ইংল্যান্ড

রিস জেমস – Image Source: static0.givemesportimages.com

১৯৯৯ সালের ৮ ডিসেম্বর ইংল্যান্ডের লন্ডনে একটি ফুটবলপ্রেমী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন রিস জেমস। তার বাবা নাইজেল জেমস একজন ফুটবল কোচ, যার কারণে খুব ছোটবেলা থেকেই রিসের ফুটবলের হাতেখড়ি হয়। মজার বিষয় হলো, রিসের বোন লরেন জেমসও একজন বিশ্বমানের ফুটবলার, যিনি চেলসি নারী দল এবং ইংল্যান্ড জাতীয় দলের অন্যতম সেরা ফরোয়ার্ড অর্থাৎ, জেমস পরিবারের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে আছে ফুটবল।

রিসের বোন লরেন জেমস – Image Source: i2-prod.mirror.co.uk

মাত্র ৬ বছর বয়সে রিস জেমস চেলসির বিখ্যাত যুব একাডেমি কোভহামে যোগ দেন। শুরুতে স্ট্রাইকার ও মিডফিল্ডার হিসেবে খেলায় তিনি পরে আক্রমণাত্মক ডিফেন্ডার হয়ে ওঠেন। যুব দলে তার নেতৃত্ব ও শারীরিক শক্তিই তাকে দ্রুত চেলসির ভবিষ্যৎ তারকা করে তোলে। 

চেলসির মূল দলে জায়গা পাওয়ার আগে ২০১৮-১৯ মৌসুমে রিস জেমসকে ধারে পাঠানো হয় চ্যাম্পিয়নশিপের দল উইগান অ্যাথলেটিকে। তরুণ রিসের জন্য সেটি ছিল এক অগ্নিপরীক্ষা।

উইগানে গিয়ে তিনি কেবল রাইট-ব্যাক হিসেবেই খেলেননি, দলের প্রয়োজনে সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার হিসেবেও মাঠ কাঁপিয়েছেন। সেই মৌসুমে তিনি উইগানের হয়ে ৯৬% ম্যাচে মাঠে নামেন এবং ক্লাবের ‘প্লেয়ার অব দ্য সিজন’ নির্বাচিত হন। উইগানের তৎকালীন কোচ ও সমর্থকরা বুঝতে পেরেছিলেন, এই ছেলে চেলসি এবং ইংল্যান্ডকে শাসন করতে আসছে।

রিস জেমস উইগান অ্যাথলেটিকে – Image Source: wigantoday.net

২০১৯ সালে চেলসির তৎকালীন ম্যানেজার এবং ক্লাব লেজেন্ড ফ্রাঙ্ক ল্যাম্পার্ড ক্লাবের তরুণ খেলোয়াড়দের ওপর ভরসা করা শুরু করেন। সেই ‘তরুণ বিপ্লব’-এর অন্যতম প্রধান মুখ ছিলেন রিস জেমস। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে চেলসির সিনিয়র দলের হয়ে তার অভিষেক হয়। নিজের প্রথম মৌসুমেই তিনি দেখান যে কেন তাকে স্পেশাল বলা হয়। উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে আয়াক্সের বিপক্ষে ৪-৪ গোলের ঐতিহাসিক ম্যাচে গোল করে তিনি চেলসির ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা হন।

জেমসের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় সোনালী মুহূর্তটি আসে ২০২০-২১ মৌসুমে। টমাস টুখেলের অধীনে চেলসি যখন উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে ম্যানচেস্টার সিটিকে ১-০ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়, তখন রিস জেমস ছিলেন ম্যাচের অন্যতম সেরা পারফর্মার। ফাইনালে সিটির বাঁ-দিকের আক্রমণভাগে থাকা রাহিম স্টার্লিংকে তিনি পুরো ম্যাচে এক ইঞ্চি জায়গাও দেননি। মাত্র ২১ বছর বয়সে ইউরোপ সেরার মুকুট মাথায় পড়েন এই ইংলিশ ডিফেন্ডার।

রিস জেমস উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স – Image Source: img.chelseafc.com

২০২৩ সালে ক্লাবের নতুন অধিনায়ক হিসেবে রিস জেমসের নাম ঘোষণা করা হয়। মাত্র ২৩ বছর বয়সে নিজের শৈশবের ক্লাবের অধিনায়ক হওয়া ছিল জেমসের জন্য এক স্বপ্নের মতো ব্যাপার।

রিস জেমসের ক্যারিয়ার যদি কেবলই প্রতিভার হতো, তবে আজ তিনি বিশ্বের এক নম্বর রাইট-ব্যাক হিসেবে অনায়াসে রাজত্ব করতেন। কিন্তু তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে দাঁড়ায় তার নিজের শরীর, বিশেষ করে তার হ্যামস্ট্রিং ইনজুরি।

২০২২ সালের বিশ্বকাপ মিস করা থেকে শুরু করে ২০২৩, ২০২৪ এবং ২০২৫ সাল পর্যন্ত জেমসকে বারবার ইনজুরির কারণে মাঠের বাইরে যেতে হয়েছে। ২০২৩ সালের শেষের দিকে তিনি তার হ্যামস্ট্রিংয়ের সমস্যা চিরতরে দূর করার জন্য একটি বড় অস্ত্রোপচার করান। এর ফলে তাকে দীর্ঘ সময় মাঠের বাইরে কাটাতে হয়। ইনজুরির এই অন্তহীন চক্রের কারণে তিনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ এবং টুর্নামেন্ট মিস করেছেন, যা চেলসি এবং ইংল্যান্ড দল উভয়ের জন্যই ছিল এক বিশাল ধাক্কা।

রিস জেমস ইনজুরি – Image Source: i.guim.co.uk

২০২০ সালের অক্টোবরে ইংল্যান্ড জাতীয় দলে রিস জেমসের অভিষেক হয়। ইংল্যান্ড দলে রাইট-ব্যাক পজিশনের জন্য তীব্র প্রতিযোগিতা চলে যেখানে কাইল ওয়াকার, ট্রেন্ট আলেকজান্ডার-আর্নল্ড এবং কিয়েরান ট্রিপিয়ারের মতো তারকারা আছেন।

২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের স্কোয়াডে রিস জেমসের অন্তর্ভুক্তি ছিল ইংল্যান্ডের জন্য সবচেয়ে বড় স্বস্তির খবর। গত কয়েক মৌসুমের ইনজুরি কাটিয়ে ২০২৫-২৬ প্রিমিয়ার লিগ মৌসুমে চেলসির হয়ে নিজেকে নতুন করে ফিট প্রমাণ করেছেন তিনি। ২০২৬ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের রক্ষণভাগকে নিচ থেকে নেতৃত্ব দেওয়া এবং ডান প্রান্ত দিয়ে আক্রমণ শাণিত করার ক্ষেত্রে জেমস থ্রি লায়ন্সদের অন্যতম বড় ট্রাম্প কার্ড।

Reference:

Related posts

গোলপোস্টের রকেট লঞ্চার এদেরসন মোরায়েস!

আশা রহমান

আলিসন বেকার: ড্রেসিংরুমের রকস্টার, মাঠের সুপারহিরো

কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে মন্ত্রিত্ব: কে এই আসিফ মাহমুদ?

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More