Image default
ক্রীড়াবিদজীবনীফুটবল

জুল কুন্দে: ফরাসি ফুটবলের ফ্যাশন আইকন

মাঠে স্ট্রাইকারদের পকেটস্থ করা আর টানেলে স্কার্ট-বুট পরে র‍্যাম্প ওয়াক করা আমাদের কুন্দে ভাই তো আসলে ফুটবলারদের ড্রেসিংরুমের উরফি জাভেদ! 

ফ্রান্স জাতীয় দলের রক্ষণভাগে তারকার অভাব নেই, কিন্তু প্রতিপক্ষের গতিময় উইঙ্গারদের বোতলবন্দী করার জন্য কোচ দিদিয়ের দেশমের সবচেয়ে বড় ভরসার নাম জুল কুন্দে। বিশেষ করে ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ থেকে শুরু করে বর্তমান ২০২৬ সালের বিশ্বমঞ্চ পর্যন্ত ফ্রান্সের রক্ষণভাগের ডান প্রান্তটি এক হাতে সামলাচ্ছেন এই তারকা। কঠোর পরিশ্রম আর হার না মানা মানসিকতার জোরে কীভাবে একজন তরুণ বিশ্বমঞ্চের কেন্দ্রবিন্দুতে আসতে পারেন, কুন্দে তার এক অনন্য উদাহরণ। 

জুল কুন্দে’র ব্যক্তিগত তথ্য:

নাম

জুলস অলিভিয়ার কুন্দে

জন্ম

১২ নভেম্বর ১৯৯৮ (বয়স ২৭)

জন্মস্থান

প্যারিস , ফ্রান্স

উচ্চতা

১.৮১ মিটার (৫ ফুট ১১ ইঞ্চি)

পজিশন

ডিফেন্ডার

ক্লাব ক্যারিয়ার

বোর্দো,সেভিয়া এবং বর্তমানে বার্সেলোনা ক্লাবের হয়ে খেলছেন।

আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার

২০২১– ফ্রান্স

জুলস কুন্দে Image Source: semprebarca.com

জুল অলিভিয়ার কুন্দে ১৯৯৮ সালের ১২ নভেম্বর প্যারিসে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ছিলেন বেনিনের বংশোদ্ভূত এবং মা ফরাসি। শৈশবেই তার বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হয়ে যায়, যার ফলে মায়ের কাছেই তিনি বড় হন। ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি তার ছিল তীব্র ঝোঁক। মাত্র ৬ বছর বয়সে তিনি স্থানীয় ক্লাব ‘ফ্রাটারনেল দে ল্যান্ডিরাস’-এ খেলা শুরু করেন।

শৈশবে কুন্দে কিন্তু খুব শান্ত স্বভাবের ছিলেন না। মাঠে হেরে গেলে বা নিজের পারফরম্যান্স মনের মতো না হলে তিনি ভীষণ রেগে যেতেন। তবে তার এই জেদটাই পরবর্তীতে তাকে একজন লড়াকু ফুটবলার হতে সাহায্য করেছে। ২০১৩ সালে ১৫ বছর বয়সে তিনি ফরাসি পেশাদার ক্লাব বোর্দোর যুব একাডেমিতে যোগ দেন। এখানেই তার ফুটবলীয় শিক্ষার আসল ভিত্তি তৈরি হয়।

বোর্দোর যুব দলে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে ফরাসি কাপের একটি ম্যাচে সিনিয়র দলের হয়ে কুন্দের অভিষেক হয়। খুব দ্রুতই তিনি ক্লাবের মূল একাদশের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠেন। মাত্র ১৯-২০ বছর বয়সেই তিনি মাঠে যে পরিপক্বতা এবং নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা দেখিয়েছিলেন, তা অনেক অভিজ্ঞ ডিফেন্ডারের মধ্যেও দেখা যায় না।

জুলস কুন্দে বল দখলের লড়াই– Image Source: tribuna.com

বোর্দোর হয়ে তিনি সব মিলিয়ে ৭০টি ম্যাচ খেলেন এবং ৪টি গোলও করেন। একজন ডিফেন্ডার হিসেবে তার উচ্চতা ৫ ফুট ১১ ইঞ্চি, সেন্ট্রাল ডিফেন্ডারদের তুলনায় কিছুটা কম হলেও, তার অবিশ্বাস্য লাফানোর ক্ষমতা এবং টাইমিংয়ের কারণে তিনি বাতাসে ভেসে আসা বলে বড় বড় স্ট্রাইকারদের পরাস্ত করতেন। ফরাসি লিগে তার এই পারফরম্যান্স ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোর নজর কাড়তে বেশি সময় নেয়নি।

২০১৯ সালের জুলাই মাসে স্প্যানিশ ক্লাব সেভিয়া ২৫ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে কুন্দেকে দলে ভেড়ায়, যা ছিল তৎকালীন সময়ে ক্লাবটির ইতিহাসের সবচেয়ে দামি সাইনিং। স্পেনে গিয়েই কুন্দে প্রমাণ করেন যে সেভিয়ার সিদ্ধান্ত কতটা সঠিক ছিল।

সেভিয়ায় ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্ডার ডিয়েগো কার্লোসের সাথে কুন্দের রক্ষণ জুটি লা লিগার অন্যতম সেরা এবং দুর্ভেদ্য জুটিতে পরিণত হয়। ২০১৯-২০ মৌসুমে সেভিয়ার উয়েফা ইউরোপা লিগ জয়ে কুন্দে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বিশেষ করে সেমিফাইনালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড এবং ফাইনালে ইন্টার মিলানের বিশ্বমানের ফরোয়ার্ডদের রুখে দিয়ে তিনি লাইমলাইটে চলে আসেন।

সেভিয়ার হয়ে তিন মৌসুমে কুন্দে ১৩৩টি ম্যাচ খেলেন এবং নিজেকে ইউরোপের অন্যতম সেরা তরুণ ‘বল-প্লেয়িং’ সেন্ট ব্যাক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। রক্ষণভাগ থেকে ঠাণ্ডা মাথায় বল নিয়ে ওপরে উঠে আসা এবং আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের নিখুঁত পাস দেওয়ার ক্ষমতাই তাকে অনন্য করে তোলে।

২০২২ সালের গ্রীষ্মকালীন দলবদলে ইউরোপের ট্রান্সফার মার্কেটে কুন্দেকে নিয়ে রীতিমতো যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। ইংলিশ ক্লাব চেলসি তাকে দলে নেওয়ার জন্য প্রায় সমস্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ফেলেছিল। কিন্তু জুল কুন্দের ইচ্ছা ছিল বার্সেলোনায় খেলার। তৎকালীন বার্সা কোচ জাভি হার্নান্দেজ কুন্দেকে সরাসরি ফোন করে তার ট্যাকটিক্যাল প্ল্যান ব্যাখ্যা করেন। জাভির সেই প্রজেক্টে অনুপ্রাণিত হয়ে চেলসির বড় অঙ্কের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে ৫০ মিলিয়ন ইউরোর চুক্তিতে বার্সেলোনায় যোগ দেন।

বার্সেলোনার জার্সিতে জুল কুন্দে– Image Source: barcablaugranes.com

বার্সেলোনায় আসার পর জুল কুন্দের ক্যারিয়ারে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। ক্লাবের প্রয়োজনে জাভি তাকে সেন্ট্রাল ডিফেন্স থেকে সরিয়ে রাইট-ব্যাক পজিশনে খেলানো শুরু করেন। শুরুতে কুন্দে এই পজিশনে খেলতে কিছুটা অস্বস্তি প্রকাশ করলেও, দলের স্বার্থে তিনি নিজেকে দারুণভাবে মানিয়ে নেন।

২০২২-২৩ মৌসুমে বার্সেলোনার লা লিগা শিরোপা জয়ে কুন্দের অবদান ছিল অনস্বীকার্য। সেই মৌসুমে বার্সা মাত্র ২০টি গোল হজম করেছিল, যা ইউরোপের শীর্ষ লিগগুলোর মধ্যে সেরা রেকর্ড ছিল। ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের বর্তমান সময় পর্যন্ত বার্সেলোনার ডিফেন্স লাইনে জুল কুন্দে একজন নির্ভরযোগ্য ‘আনসাং হিরো’ হিসেবে নিজের দায়িত্ব পালন করে চলেছেন।

২০২১ সালের জুনে ওয়েলসের বিপক্ষে এক প্রীতি ম্যাচে ফ্রান্সের জাতীয় দলের হয়ে কুন্দের অভিষেক হয়। ২০২১ সালের উয়েফা নেশনস লিগ জয়ী ফ্রান্স দলের সদস্য ছিলেন তিনি।

তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা আসে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে। কোচ দিদিয়ের দেশম বেনজামিন পাভার্ডের জায়গায় কুন্দেকে ফ্রান্সের মূল রাইট-ব্যাক হিসেবে খেলানোর সিদ্ধান্ত নেন। কুন্দে সেই সুযোগের শতভাগ ব্যবহার করেন। পুরো টুর্নামেন্টে রাইট-ব্যাক পজিশনে তার রক্ষণাত্মক দৃঢ়তা ফ্রান্সকে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে তুলতে সাহায্য করে। ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ১২০ মিনিটের মহাকাব্যিক লড়াইয়ে তিনি মাঠে ছিলেন এবং নিজের সেরাটা দিয়েছিলেন।

বল দখলের লড়াইয়ে জুল কুন্দে– Image Source: shutterstock.com

২০২৪ সালের ইউরো কাপ এবং বর্তমান ২০২৬ বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জন পর্বের ম্যাচগুলোতেও ফ্রান্সের রক্ষণভাগের ডান প্রান্তটি জুল কুন্দেই সামলাচ্ছেন। উত্তর আমেরিকার মাটিতে বসা এই মেগা বিশ্বকাপে ফ্রান্স জাতীয় দলের ডিফেন্স লাইনের অন্যতম প্রধান এবং নির্ভরযোগ্য স্তম্ভের নাম জুল কুন্দে। দিদিয়ের দেশমের বিশ্বজয়ী কৌশলে ডান প্রান্ত বা রাইট-ব্যাক পজিশনটি সম্পূর্ণ লক করে রাখার মূল দায়িত্বটি রয়েছে বার্সেলোনার এই মহাতারকার কাঁধেই।

২০২২ কাতার বিশ্বকাপে রানার্স-আপ হওয়ার পর থেকে ফ্রান্স দলে রাইট-ব্যাক পজিশনে কুন্দে নিজেকে অনস্বীকার্য করে তুলেছেন। ২০২৬ সালের এই বিশ্বকাপে এসে ২৬ বছর বয়সী কুন্দে তার ক্যারিয়ারের সেরা ছন্দে আছেন। প্রতিপক্ষের গতিময় এবং ড্রিবলিংয়ে ওস্তাদ উইঙ্গারদের বোতলবন্দী করতে কুন্দের কোনো জুড়ি নেই। উইলিয়াম সালিবা এবং ইব্রাহিমা কোনাতের সাথে তার রক্ষণাত্মক বোঝাপড়া ফরাসি ডিফেন্সকে এই বিশ্বকাপের অন্যতম দুর্ভেদ্য দুর্গে পরিণত করেছে।

মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি ২০২৬ বিশ্বকাপেও টিম হোটেলের টানেল বা স্টেডিয়াম এন্ট্রিতে কুন্দে তার ফ্যাশন সেন্স দিয়ে পুরো বিশ্ব মিডিয়ার নজর কেড়ে নিচ্ছেন। হাই-হিল বুট, ওভারসাইজড ভিন্টেজ জ্যাকেট কিংবা তার সিগনেচার সানগ্লাস পরে যখন তিনি আমেরিকার বড় বড় স্টেডিয়ামে পা রাখছেন, তখন ভক্তদের মনে একটাই প্রশ্ন জাগছে তিনি ফুটবল বিশ্বকাপ খেলতে এসেছেন নাকি লস অ্যাঞ্জেলেসের কোনো ফ্যাশন উইকের র‍্যাম্প ওয়াক করতে!

Reference:

Related posts

যোগেন মন্ডল- রাজনীতির হারিয়ে যাওয়া নক্ষত্র

৬ বিশ্বকাপের কিংবদন্তি গুইলার্মো ওচোয়া

লিসান্দ্রো মার্টিনেজ: মাঠে কসাই, ঘরে খাঁটি প্রেমিক

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More