মাঠে বল কাড়ার চেয়ে প্রতিপক্ষের পা কাটতে কোনে এতটাই ভালোবাসতেন যে, রেফারিরা উনাকে ভালোবেসে এক মৌসুমেই ১২ বার ‘প্রেমের লাল-হলুদ চিঠি’ ধরিয়ে দিয়েছিলেন!
মানু কোনে ফরাসি ফুটবলের নতুন ‘মিডফিল্ড ইঞ্জিন’। মাঠে উনার কাজ একটাই রক্ষণ থেকে বল কেড়ে নিয়ে এমন স্পিডে আক্রমণে ওঠা, যেন পেছনে কেউ তাড়া করেছে! প্রতিপক্ষের পা থেকে বল চুরির এই ‘একক ডাকাতি’ আর বক্স-টু-বক্স দৌড়ানোর ক্ষমতার কারণে রেফারি থেকে শুরু করে প্রতিপক্ষ সবাই উনাকে সমীহ করে চলে। বর্তমানে তিনি সিরি-এ’র ক্লাব এএস রোমায় খেলছেন, আর রোমান সাম্রাজ্যের মাঝমাঠে প্রতিপক্ষের হাড়গোড় ভাঙার দায়িত্বটা একাই সামলাচ্ছেন!
মানু কোনে- এর ব্যক্তিগত তথ্য:
|
নাম |
কাউদিও ইমানুয়েল বরিস কোনে |
|
জন্ম |
১৭ মে ২০০১ (বয়স ২৫) |
|
জন্মস্থান |
কলোম্বেস , ফ্রান্স |
|
উচ্চতা |
১.৮৫ মিটার (৬ ফুট ১ ইঞ্চি) |
|
পজিশন |
মিডফিল্ডার |
|
ক্লাব ক্যারিয়ার |
টুলুজ,বরুসিয়া মনশেনগ্লাডবাখ এবং বর্তমানে রোমা ক্লাবের হয়ে খেলছেন। |
|
আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার |
২০২৪– ফ্রান্স |

২০০১ সালের ১৭ মে ফ্রান্সের কলম্বেসে জন্মগ্রহণ করা মানু কোনের ফুটবল যাত্রা শুরু হয়েছিল ফ্রান্সের স্থানীয় কিছু ক্লাবের একাডেমিতে। আইভরি কোস্ট বংশোদ্ভূত এই ফরাসি ফুটবলার ছোটবেলা থেকেই বল পায়ে দারুণ দক্ষ ছিলেন। ২০০৭ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত তিনি ভিলেনেভ-লা-গারেন ক্লাবে খেলেন। এরপর প্যারিস এফসি এবং বুলোন-বিয়ানকুরের মতো একাডেমিতে নিজের প্রতিভাকে আরও শাণিত করেন।
২০১৬ সালে ফ্রান্সের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব তুলুজ তাদের যুব একাডেমিতে কোনেকে যুক্ত করে। তুলুজের যুব দলেই মূলত তার পেশাদার মিডফিল্ডার হয়ে ওঠার আসল ভিত তৈরি হয়।
২০১৯ সালের ২৪ মে দিজঁ-এর বিরুদ্ধে ম্যাচ দিয়ে তুলুজের হয়ে ফরাসি লিগ ওয়ানে পেশাদার ফুটবলে অভিষেক হয় কোনের। শুরুর দিকে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে খেললেও ২০২০-২১ মৌসুমে লিগ টু-তে তিনি ক্লাবের নিয়মিত স্টার্টার হয়ে ওঠেন। সেই মৌসুমে তিনি তুলুজের হয়ে ৪২টি ম্যাচ খেলেন এবং ৫টি গোল করেন। মাঝমাঠে বল কেড়ে নেওয়া এবং রক্ষণের বুক চিরে ওপরে ওঠার ক্ষমতা দেখে ইউরোপের বড় বড় ক্লাবের স্কাউটদের নজরে পড়েন তিনি।
২০২১ সালের জানুয়ারিতে জার্মানির বুন্দেসলিগার ক্লাব বরুশিয়া মনশেনগ্লাডবাখ প্রায় ৯ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে কোনেকে দলে ভেড়ায়। তবে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত তিনি লোনে তুলুজেই খেলেন।

জার্মানিতে আসার পর মানু কোনে নিজের খেলার ধার আরও বাড়িয়ে নেন। বুন্দেসলিগার গতিময় ফুটবলের সঙ্গে তিনি খুব দ্রুত মানিয়ে নেন। ২০২১ সালের ২৭ অক্টোবর ডিএফবি-পোকাল কাপে বায়ার্ন মিউনিখের বিরুদ্ধে মনশেনগ্লাডবাখের ঐতিহাসিক ৫-০ গোলের জয়ের ম্যাচে তিনি নিজের প্রথম গোলটি করেন। গ্লাডবাখের হয়ে তিন মৌসুমে তিনি প্রায় ৭৯টি ম্যাচ খেলেন।
রক্ষণাত্মক মিডফিল্ডার হিসেবে প্রতিপক্ষের পা থেকে বল কেড়ে নেওয়া এবং পাসিং লেন ব্লক করায় তিনি ওস্তাদ। তবে বুন্দেসলিগায় খেলার সময় তিনি বেশ ফাউল করতেন, যার কারণে ২০২২-২৩ মৌসুমে সর্বোচ্চ ১২টি হলুদ কার্ড পেয়েছিলেন। সময়ের সাথে সাথে তার এই আগ্রাসী মনোভাব কিছুটা পরিপক্ব হয়েছে।
২০২৪ সালের ৩০ আগস্ট মানু কোনে ইতালির বিখ্যাত ক্লাব এএস রোমা-তে যোগ দেন। প্রথমে ১৮ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে ধারে আসলেও পরবর্তী সময়ে স্থায়ী চুক্তির বাধ্যবাধকতায় তিনি ২০২৯ সাল পর্যন্ত রোমার সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন।

রোমায় আসার পর ইতালিয়ান ফুটবল শৈলীর ডিফেন্সিভ এবং ট্যাকটিক্যাল দিকটির সাথে নিজেকে দারুণভাবে মানিয়ে নিয়েছেন কোনে। ২০২৪-২৫ মৌসুমে ক্লাবের ঘনঘন কোচ পরিবর্তন সত্ত্বেও মানু কোনে রোমার মাঝমাঠের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠেন। ২০২৫-২৬ মৌসুমেও তিনি সিরি-এ এবং উয়েফা ইউরোপা লিগে রোমার হয়ে দুর্দান্ত পারফর্ম করছেন।
মানু কোনে ফ্রান্সের অনূর্ধ্ব-১৮, অনূর্ধ্ব-১৯ এবং অনূর্ধ্ব-২১ দলের হয়ে খেলেছেন। ২০২৪ সালের প্যারিস অলিম্পিকে থিয়েরি অঁরির অধীনে ফ্রান্স অলিম্পিক দলের হয়ে তিনি রৌপ্য পদক জয় করেন।
অলিম্পিকে চমৎকার পারফরম্যান্সের পুরস্কার হিসেবে ২০২৪ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ইতালি জাতীয় দলের বিপক্ষে ম্যাচে ফ্রান্সের মূল জাতীয় দলের হয়ে তার অভিষেক হয়। মাঝমাঠে এনগোলো কান্তে, অরেলিয়ান চুয়ামেনি কিংবা এডুয়ার্ডো কামাভিঙ্গার মতো তারকাদের ভিড়েও কোনে নিজের জায়গা তৈরি করে নিয়েছেন। সমসাময়িক সময়ে চমৎকার ফর্মের কারণে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের ফ্রান্স স্কোয়াডেও তিনি ডাক পেয়েছেন।

ফ্রান্সের মাঝমাঠ মানেই এক মহাশক্তিশালী দুর্গ, আর ২০২৬ বিশ্বকাপে সেই দুর্গের নতুন প্রহরী হলেন মানু কোনে। এনগোলো কান্তে বা পগবাদের উত্তরসূরি হিসেবে ফ্রান্সের ব্লু-জার্সিতে বিশ্বকাপের মঞ্চে পা রাখছেন এই রোমা তারকা। গতি, ট্যাকলিং আর নিখুঁত ড্রিবলিং দিয়ে দিদিয়ে দেশমের মাস্টারপ্ল্যানে তিনি হতে যাচ্ছেন ফরাসিদের ট্রাম্পকার্ড। অলিম্পিকের রুপা জয়ের পর এবার লক্ষ্যটা নিশ্চিতভাবেই সোনালী ট্রফিটার দিকে!
Reference:

