একসময়ের ভুতুড়ে গুদামঘর, এখন সেলফি তোলার হটস্পট!xa0
ইয়োকোহামা রেড ব্রিক ওয়্যারহাউস স্থানীয়ভাবে যা ‘আকায়েংগা সোকো’ নামে পরিচিত। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে নির্মিত এই ঐতিহাসিক লাল ইটের কাস্টমস গুদামঘরটি আজ টোকিওর কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা বন্দর নগরী ইয়োকোহামার অন্যতম সেরা শপিং, ডাইনিং এবং কালচারাল হটস্পট। একসময়ের পরিত্যক্ত ও ভুতুড়ে এই ডকইয়ার্ডটি এখন সমুদ্রের চমৎকার হাওয়া, দারুণ সব সিজনাল উৎসব আর শৈল্পিক আবহে জমজমাট এক পর্যটন কেন্দ্র।xa0

রেড ব্রিক ওয়্যারহাউসের ইতিহাস মূলত জাপানের আধুনিকায়নের ইতিহাসের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ১৮৫৯ সালে মেইজি যুগে ইয়োকোহামা বন্দর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য খুলে দেওয়া হয়। খুব দ্রুতই এটি জাপানের প্রধান প্রবেশদ্বার এবং সিল্ক ও চায়ের মতো মূল্যবান পণ্য রপ্তানির প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়।
বন্দরের এই বিপুল বাণিজ্যিক চাপ সামলানোর জন্য এবং বিদেশ থেকে আসা পণ্যের কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স ও নিরাপদ সংরক্ষণের জন্য একটি আধুনিক গুদামঘরের প্রয়োজন দেখা দেয়। এই উদ্দেশ্যেই তৎকালীন বিশ্বখ্যাত জাপানি স্থপতি তোরি সুমুমো-এর নকশায় এই ওয়্যারহাউস দুটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়।

নির্মাণের পর থেকেই এটি জাপানের রাষ্ট্রীয় বাণিজ্যের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করতে শুরু করে। তৎকালীন সময়ে এই গুদামঘরগুলোতে মূলত আমদানি করা টেক্সটাইল, তামাক এবং অন্যান্য মূল্যবান সরকারি মালামাল রাখা হতো।
রেড ব্রিক ওয়্যারহাউস শুধুমাত্র দুটি লাল ইটের দালান নয়, এটি তৎকালীন প্রকৌশল বিদ্যার এক অনন্য নিদর্শন। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে জাপান যখন পশ্চিমা প্রযুক্তি গ্রহণ করতে শুরু করেছিল, তখন এই ভবন দুটিকে তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে আধুনিক এবং নিরাপদ কাঠামো হিসেবে গড়ে তোলা হয়।

জাপান একটি ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ। তাই এই বিশাল ইটের কাঠামোকে টিকিয়ে রাখতে প্রথম বারের মতো ব্যবহার করা হয়েছিল বিশেষ প্রযুক্তির লোহার ফ্রেম। ইটের দেয়ালের ভেতরে লোহার রড ও বিম দিয়ে এমনভাবে খাঁচা তৈরি করা হয়েছিল, যা ভবনটিকে প্রচণ্ড কম্পনের হাত থেকে রক্ষা করে। একে বলা হয় ‘রিইনফোর্সড ব্রিক কনস্ট্রাকশন ‘। ১৯২৩ সালের প্রলয়ঙ্করী ‘গ্রেট কান্টো ভূমিকম্প’ যখন পুরো ইয়োকোহামা শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল, তখনও এই রেড ব্রিক ওয়্যারহাউস দুটি প্রায় অক্ষত অবস্থায় দাঁড়িয়ে ছিল।
গুদামঘরে মালামাল ওঠানামার সুবিধার্থে এখানে বসানো হয়েছিল বিদ্যুৎচালিত কার্গো লিফট এবং বিশেষ ক্রেন, যা তৎকালীন জাপানে ছিল সম্পূর্ণ নতুন এবং বিস্ময়কর। ভবনের ছাদ তৈরি করা হয়েছিল খাঁটি তামা দিয়ে, যা সময়ের সাথে সাথে এক ধরনের সবুজ আভা তৈরি করত। এর জানালার ফ্রেম এবং দরজার জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল ভারী লোহা, যা এর নিরাপত্তা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল।
রেড ব্রিক ওয়্যারহাউসের পথচলা সবসময় মসৃণ ছিল না। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে এসে এই স্থাপনাটি এক চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইয়োকোহামা বন্দরে ব্যাপক বোমাবর্ষণ করা হয়। তবে সৌভাগ্যবশত এই লাল ইটের ভবন দুটি বড় কোনো ক্ষয়ক্ষতির হাত থেকে বেঁচে যায়। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর, ১৯৪৫ সালে মিত্রবাহিনী জাপান দখল করে। মার্কিন সেনারা এই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ওয়্যারহাউস দুটিকে তাদের নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয় এবং এটিকে তাদের সামরিক সদর দফতর ও লজিস্টিক সাপোর্ট সেন্টার হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে।

১৯৫৬ সালে মার্কিন বাহিনী ভবন দুটি জাপানের কাছে হস্তান্তর করে। কিন্তু ততদিনে বিশ্ব বাণিজ্যের ধরন বদলে গেছে। বিশাল আকৃতির কন্টেইনার শিপের আগমন ঘটে এবং ইয়োকোহামা বন্দরের মূল বাণিজ্যিক কার্যক্রম রেড ব্রিক ওয়্যারহাউস থেকে দূরে, আরও গভীর সমুদ্রের দিকে স্থানান্তরিত হয়।
ফলস্বরূপ, ১৯৬০ থেকে ১৯৮০-এর দশক পর্যন্ত এই ভবন দুটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দেয়ালের লাল ইটের রঙ চটে যায়, জানালার কাঁচ ভেঙে যায় এবং পুরো এলাকাটি একটি ভুতুড়ে রূপ নেয়। অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে, ১৯৮০-র দশকে ইয়োকোহামা সিটি কর্তৃপক্ষ এটিকে পুরোপুরি ভেঙে ফেলে সেখানে নতুন আধুনিক বহুতল ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিল।
ঠিক এই সময়েই ইয়োকোহামার সচেতন নাগরিক এবং ইতিহাসবিদরা এই ঐতিহাসিক ভবনটি রক্ষার জন্য আন্দোলন শুরু করেন। তারা যুক্তি দেন যে, এই ভবন দুটি ইয়োকোহামার জন্ম এবং জাপানের আধুনিকায়নের প্রতীক। অবশেষে, ১৯৮৯ সালে সিটি কর্তৃপক্ষ তাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে এবং ভবন দুটি কিনে নেয়।
দীর্ঘ ৯ বছর ধরে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এর সংস্কার কাজ চালানো হয়। মূল ঐতিহাসিক কাঠামো, লাল ইটের দেয়াল এবং ভেতরের লোহার বিমগুলোকে ঠিক রেখে এর ভেতরে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা যোগ করা হয়। অবশেষে, ২০০২ সালের ১২ এপ্রিল, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এই কমপ্লেক্সটি একটি কালচারাল ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে সাধারণ মানুষের জন্য পুনরায় উন্মুক্ত করা হয়। এই প্রকল্পের সাফল্যের জন্য এটি পরবর্তীতে ইউনেস্কো এশিয়া-প্যাসিফিক হেরিটেজ অ্যাওয়ার্ড লাভ করে।
আজকের দিনে রেড ব্রিক ওয়্যারহাউস একটি প্রাণবন্ত বিনোদন কেন্দ্র। পুরো কমপ্লেক্সটি মূলত দুটি প্রধান ভবনে বিভক্ত, যার প্রতিটির উদ্দেশ্য আলাদা।

বিল্ডিং ১-টি মূলত সংস্কৃতিমনা মানুষের জন্য সাজানো হয়েছে। এর তিন তলা জুড়ে রয়েছে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ব্যবস্থা। এখানে রয়েছে ছোট ছোট আর্ট গ্যালারি এবং এক্সিবিশন স্পেস। এখানে স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক শিল্পীদের চিত্রকর্ম, ভাস্কর্য এবং ফটোগ্রাফি প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া কিছু চমৎকার স্যুভেনিয়ার শপ রয়েছে যেখানে ঐতিহ্যবাহী জাপানি ক্রাফট পাওয়া যায়। এই তলায় রয়েছে প্রায় ৩০০ আসন বিশিষ্ট একটি আধুনিক থিয়েটার হল (Yokohama Akarenga Hall)। এখানে নিয়মিত নাটক, কনসার্ট, ড্যান্স পারফরম্যান্স এবং সিনেমা স্ক্রিনিং করা হয়।
বিল্ডিং ২আপনি যদি কেনাকাটা করতে এবং খেতে ভালোবাসেন, তবে বিল্ডিং ২ আপনার জন্য পারফেক্ট জায়গা। এর ভেতরে ৫০টিরও বেশি ইউনিক দোকান এবং রেস্তোরাঁ রয়েছে। এখানে সাধারণ শপিং মলের মতো বড় বড় গ্লোবাল ব্র্যান্ডের দোকান নেই। বরং এখানে স্থান পেয়েছে জাপানের স্থানীয় বুটিক, হাতে তৈরি জুয়েলারি, চামড়ার জিনিসপত্র এবং ইন্টেরিয়র ডিজাইনের সামগ্রী। এখানকার দোকানগুলো থেকে কেনা জিনিসপত্র স্মৃতিচিহ্ন বা গিফট হিসেবে দেওয়ার জন্য চমৎকার।
এর নিচতলায় রয়েছে একটি বিশাল ফুড কোর্ট, যেখানে জাপানি রামেন, সুশি থেকে শুরু করে ওয়েস্টার্ন বার্গার, পিৎজা এবং পাস্তা পাওয়া যায়। এছাড়া এখানে রয়েছে বেশ কিছু ঐতিহ্যবাহী জাপানি ক্যাফে, যেখানে বসে আপনি সমুদ্রের মনোরম দৃশ্য দেখতে দেখতে বিকেলের কফি বা গ্রিন টি উপভোগ করতে পারবেন।
রেড ব্রিক ওয়্যারহাউসের অন্যতম বড় আকর্ষণ হলো এর দুটি ভবনের মাঝখানে থাকা বিশাল খোলা চত্বরটি । এখানে সারা বছরই কোনো না কোনো আন্তর্জাতিক মানের উৎসব বা মেলার আয়োজন করা হয়।
পর্যটকদের জন্য কিছু দরকারি টিপস
আপনি যদি ইয়োকোহামা রেড ব্রিক ওয়্যারহাউস ভ্রমণের পরিকল্পনা করে থাকেন, তবে নিচের তথ্যগুলো আপনার উপকারে আসবে:
- টোকিও স্টেশন বা শিবুইয়া স্টেশন থেকে ট্রেনে করে খুব সহজেই ইয়োকোহামা আসা যায়। মিনাতোমিরই লাইনের ‘বাশামিশি’ বা ‘নিহন-ওদোরি’ স্টেশন থেকে মাত্র ৬-৭ মিনিট হাঁটলেই এই ওয়্যারহাউসে পৌঁছানো যায়।
- দুপুরের শেষের দিকে এখানে আসা সবচেয়ে ভালো। এতে করে আপনি দিনের আলোতে এর সৌন্দর্য দেখতে পারবেন, আবার সন্ধ্যার পর যখন পুরো দালানটি সোনালী আলোয় ঝলমল করে ওঠে, সেই চমৎকার দৃশ্যও মিস হবে না।
- এর ঠিক পাশেই রয়েছে বিখ্যাত ‘কাপ নুডলস মিউজিয়াম’, ‘কসমো ওয়ার্ল্ড’ (যেখানে বিখ্যাত ফেরিস হুইল আছে) এবং ‘ইয়োকোহামা এয়ার ক্যাবল কার’। আপনি একদিনের প্ল্যানে এই সবগুলো স্থান একসাথে ঘুরে দেখতে পারেন।

ইয়োকোহামা রেড ব্রিক ওয়্যারহাউস সম্পর্কে চমৎকার এবং অদ্ভুত তথ্যxa0
লাইটপোস্টে এখনো লুকিয়ে আছে ‘আমেরিকান’ ইতিহাস!
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন সামরিক বাহিনী যখন এটিকে তাদের সদর দফতর হিসেবে ব্যবহার করত, তখন তারা পুরো কমপ্লেক্সের ভেতরে নিজস্ব কিছু পরিবর্তন এনেছিল। ওয়্যারহাউসের বাইরে এখনো এমন কিছু পুরোনো লোহার লাইটপোস্ট বা খুঁটি রয়েছে, যেগুলোতে আলতো করে তাকালে “U.S. ARMY” লেখা খোদাই করা দেখতে পাবেন। এটি ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষী।
জাপানের প্রথম ‘ফায়ার স্প্রিঙ্কলার’ এবং ‘কপার রুফ’

স্থাপত্যের দিক থেকে এটি ছিল তৎকালীন জাপানের সবচেয়ে আধুনিক ভবন। মালামাল যেন আগুনে পুড়ে নষ্ট না হয়, সেজন্য ১৯১০ এর দশকেই এখানে জাপানের প্রথম স্বয়ংক্রিয় ফায়ার স্প্রিঙ্কলার সিস্টেম বসানো হয়েছিল। এছাড়া এর ছাদ তৈরি করা হয়েছিল খাঁটি তামা দিয়ে। সময়ের সাথে সাথে তামার ওপর মরিচা পড়ে তা সবুজ রঙ ধারণ করত, যা ভবনটিকে দূর থেকে এক অনন্য রূপ দিত।
কন্টেইনারের আবিষ্কারই ছিল এর পতনের কারণ!
এক সময় যে ওয়্যারহাউস চব্বিশ ঘণ্টা ব্যস্ত থাকত, তা হুট করে পরিত্যক্ত হওয়ার মূল কারণ ছিল ‘কন্টেইনার’ এবং আধুনিক বড় জাহাজের আবিষ্কার। ১৯৬০-এর দশকে যখন বিশ্বজুড়ে বিশাল আকৃতির কন্টেইনার জাহাজের প্রচলন শুরু হয়, তখন রেড ব্রিক ওয়্যারহাউসের পাশের ডক বা বন্দরটি সেই বড় জাহাজগুলোর নোঙর ফেলার জন্য যথেষ্ট গভীর ছিল না। ফলে রাতারাতি এর গুরুত্ব কমে যায় এবং এটি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে।
সিনেমা এবং নাটকের ‘হটস্পট’

পরিত্যক্ত থাকার দিনগুলোতে (১৯৮০ ও ৯০-এর দশকে) এর ভুতুড়ে এবং ক্লাসিক লুকের কারণে এটি জাপানি চলচ্চিত্র পরিচালক এবং মিউজিক ভিডিও নির্মাতাদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। জাপানের বহু বিখ্যাত অ্যাকশন সিনেমা, ডিটেকটিভ নাটক এবং পপ ব্যান্ডের মিউজিক ভিডিওর শুটিং হয়েছে এই ভাঙা জানালার লাল ইটের দেয়ালগুলোকে ব্যাকগ্রাউন্ড বানিয়ে।
ইটের নিচে লুকানো ‘লেগো’ স্টাইল লোহার খাঁচা!
বাইরে থেকে ভবনটিকে শুধু ইটের তৈরি মনে হলেও, এর ভেতরে রয়েছে লোহার এক বিশাল কঙ্কাল বা খাঁচা। ১৯০৭ সালে যখন এর নির্মাণ কাজ শুরু হয়, তখন স্থপতিরা প্রতিটি ইটের ফাঁকে ফাঁকে লোহার রড এবং বিম এমনভাবে জুড়ে দিয়েছিলেন, যাতে ভূমিকম্প হলেও ইটগুলো মচকে যাবে কিন্তু ভেঙে পড়বে না। এই অবিশ্বাস্য প্রযুক্তির কারণেই ১৯২৩ সালের প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পে পুরো শহর মাটির সাথে মিশে গেলেও এই দুটি ভবন সোজা দাঁড়িয়ে ছিল।
Reference:

