চার চারটে দেশের জাতীয় দল যেন মাইকেল ওলিসের জন্য রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস বানিয়ে রেখেছিল “টানাটানি চারদিকে, কিন্তু মন শুধু ফ্রান্সে গিয়েই টিকলো!
মাইকেল ওলিসের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের পটভূমি ফুটবল বিশ্বের অন্যতম জটিল ও রোমাঞ্চকর গল্প। ২০০১ সালে ইংল্যান্ডের লন্ডনে জন্ম নেওয়ার কারণে তিনি জন্মসূত্রে ব্রিটিশ। তাঁর বাবা নাইজেরিয়ান এবং মা ফরাসি-আলজেরিয়ান বংশোদ্ভূত। ফিফার নিয়ম অনুযায়ী তিনি এক সাথে ইংল্যান্ড, নাইজেরিয়া, আলজেরিয়া ও ফ্রান্স এই ৪টি দেশের হয়েই আন্তর্জাতিক ফুটবল খেলার আইনি যোগ্যতা রাখতেন। চার দেশের ফুটবল বোর্ডই তাঁকে দলে টানার আপ্রাণ চেষ্টা করেছে। নাইজেরিয়া তো ২০২১ সালে আফ্রিকান কাপ অব নেশনসের স্ট্যান্ডবাই তালিকায় তাঁর নামও ঢুকিয়ে দিয়েছিল! তবে ওলিসে সব প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে মায়ের দেশ ফ্রান্সের হয়ে খেলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন।
মাইকেল ওলিসের ব্যক্তিগত তথ্য:
|
নাম |
মাইকেল আকপোভি ওলিসে |
|
জন্ম |
১২ ডিসেম্বর ২০০১ (বয়স ২৪) |
|
জন্মস্থান |
হোয়াইট সিটি , গ্রেটার লন্ডন, ইংল্যান্ড |
|
উচ্চতা |
১.৮০ মিটার (৫ ফুট ১১ ইঞ্চি) |
|
পজিশন |
উইঙ্গার / অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার |
|
ক্লাব ক্যারিয়ার |
রিডিং,ক্রিস্টাল প্যালেস এবং বর্তমানে বায়ার্ন মিউনিখ ক্লাবের হয়ে খেলছেন। |
|
আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার |
২০২৪– ফ্রান্স |

যুব ক্যারিয়ারে ওলিসে ফ্রান্স অনুর্ধ্ব-১৮ এবং অনুর্ধ্ব-২১ দলের হয়ে খেলেন। এরপর ২০২৪ সালের প্যারিস অলিম্পিকে থিয়েরি অঁরির অধীনে ফ্রান্স অলিম্পিক দলের হয়ে তাঁর পারফরম্যান্স ছিল এক কথায় অবিশ্বাস্য। টুর্নামেন্টে ৭ ম্যাচে ২ গোল এবং ৫টি অ্যাসিস্ট করে তিনি ফ্রান্সকে রুপো জেতাতে মূল ভূমিকা পালন করেন। অলিম্পিকের এই দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর ফ্রান্সের মূল জাতীয় দলের কোচ দিদিয়ের দেশম তাঁকে দলে ডাকেন এবং ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ইতালি ও বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে নেশনস লিগের ম্যাচে ফ্রান্সের মূল জার্সি গায়ে তাঁর অভিষেক হয়। চার দেশের টানাটানির অবসান ঘটিয়ে মাইকেল ওলিসে এখন ফরাসি ফুটবলের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।
লন্ডনে জন্ম নেওয়া ওলিসের ফুটবলের হাতেখড়ি হয়েছিল অত্যন্ত রাজকীয়ভাবে। খুব ছোটবেলাতেই তাঁর প্রতিভা স্কাউটদের নজর কেড়েছিল। মাত্র সাত বছর বয়সে ২০০৯ সালে তিনি ইংল্যান্ডের অন্যতম সেরা ক্লাব চেলসির যুব একাডেমিতে যোগ দেন। চেলসিতে তিনি প্রায় সাত বছর কাটান এবং নিজের টেকনিক্যাল দক্ষতার বিকাশ ঘটান।
২০১৬ সালে তিনি চেলসি ছেড়ে ম্যানচেস্টার সিটির একাডেমিতে যোগ দেন। তবে সিটিতে তাঁর সময়টা দীর্ঘ হয়নি। এক বছর পরেই তিনি রিডিং ক্লাবের যুব দলে চলে আসেন। বড় বড় ক্লাবের একাডেমি ছেড়ে রিডিংয়ের মতো ক্লাবে আসা ওলিসের ক্যারিয়ারের জন্য একটি টার্নিং পয়েন্ট ছিল। কারণ এখানে তিনি দ্রুত মূল দলে খেলার সুযোগ পান, যা তাঁর মতো তরুণ খেলোয়াড়ের আত্মবিশ্বাস তৈরিতে দারুণ সাহায্য করেছিল।

২০১৯ সালের মার্চ মাসে মাত্র ১৭ বছর বয়সে রিডিংয়ের হয়ে চ্যাম্পিয়নশিপে ওলিসের পেশাদার অভিষেক হয়। চ্যাম্পিয়নশিপ লিগটি বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম কঠিন এবং শারীরিক শক্তিনির্ভর লিগ হিসেবে পরিচিত। সেখানে একজন ১৭-১৮ বছরের কিশোরের পক্ষে টিকে থাকা এবং নিজের জাত চেনানো মোটেও সহজ ছিল না। কিন্তু ওলিসে তাঁর অসাধারণ ফুটবল বুদ্ধিমত্তা দিয়ে দ্রুতই সবার নজর কাড়েন।
২০২০-২১ মৌসুমটি ছিল মাইকেল ওলিসের ক্যারিয়ারের প্রথম ব্রেক-থ্রু মৌসুম। সেই মৌসুমে রিডিংয়ের হয়ে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৪৬ ম্যাচে তিনি ৭টি গোল করেন এবং ১২টি অ্যাসিস্ট করেন। চ্যাম্পিয়নশিপের মতো কঠিন লিগে এই পারফরম্যান্সের কারণে তিনি “EFL Young Player of the Season” নির্বাচিত হন এবং লিগের বর্ষসেরা দলেও জায়গা করে নেন। এই এক মৌসুমের পারফরম্যান্সই ইউরোপের বড় বড় ক্লাবগুলোর স্কাউটদের রিডিংয়ের দিকে তাকাতে বাধ্য করে।
২০২১ সালের জুলাই মাসে প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব ক্রিস্টাল প্যালেস মাত্র ৮.৩ মিলিয়ন পাউন্ডের রিলিজ ক্লজ দিয়ে মাইকেল ওলিসেকে দলে ভেড়ায়। তৎকালীন প্যালেস ম্যানেজার এবং ফরাসি কিংবদন্তি প্যাট্রিক ভিয়েরা ওলিসের ভেতরের প্রতিভাকে খুব ভালোভাবে চিনতে পেরেছিলেন।
ক্রিস্টাল প্যালেসে প্রথম দুই মৌসুমে ওলিসে মূলত একজন ক্রিয়েটর বা বল জোগানদাতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তাঁর নিখুঁত ক্রস এবং কর্নার কিকগুলো প্যালেসের আক্রমণের প্রধান হাতিয়ার হয়ে ওঠে। তবে ২০২৩-২৪ মৌসুমে তিনি কেবল উইংয়ে বল নিয়ে ক্রস করার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ভেতরের দিকে ঢুকে সরাসরি গোল করায় মনোযোগ দেন। হ্যামস্ট্রিং ইনজুরির কারণে সেই মৌসুমে তিনি মাত্র ১৯টি ম্যাচ খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন, কিন্তু সেই অল্প সুযোগেই তিনি ১০টি গোল এবং ৬টি অ্যাসিস্ট করে পুরো প্রিমিয়ার লিগকে স্তব্ধ করে দেন।

২০২৪ সালের গ্রীষ্মকালীন ট্রান্সফার উইন্ডোতে মাইকেল ওলিসেকে দলে নেওয়ার জন্য চেলসি, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড এবং লিভারপুলের মতো জায়ান্টরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। কিন্তু সবাইকে চমকে দিয়ে ওলিসে জার্মানির সফলতম ক্লাব বায়ার্ন মিউনিখে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। বায়ার্ন প্রায় ৫৩ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে এই ফরাসি উইঙ্গারকে পাঁচ বছরের চুক্তিতে আলিয়াঞ্জ অ্যারেনায় নিয়ে আসে।
বুন্দেসলিগা এবং চ্যাম্পিয়ন্স লিগে বায়ার্নের হয়ে তাঁর অভিষেক মৌসুম থেকেই তিনি নিয়মিত গোল এবং অ্যাসিস্ট করে দলের অপরিহার্য অংশে পরিণত হয়েছেন। হ্যারি কেইন এবং জামাল মুসিয়ালার সাথে তাঁর বোঝাপড়া বায়ার্নের আক্রমণভাগকে ইউরোপের অন্যতম সেরা করে তুলেছে।
ফুটবলাররা সাধারণত গোল করার পর বা মিডিয়ার সামনে অনেক বেশি আবেগপ্রবণ ও মুখর হয়ে থাকেন। কিন্তু মাইকেল ওলিসে এই ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর বাসিন্দা। তিনি অত্যন্ত শান্ত, অন্তর্মুখী এবং প্রচারবিমুখ একজন মানুষ। মিডিয়ার সামনে কথা বলতে তিনি একদমই পছন্দ করেন না।
রিডিং ক্লাবে খেলার সময় একবার গোল করার পর তাঁর একটি ইন্টারভিউ সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক ভাইরাল হয়েছিল। সাংবাদিক যখন তাঁকে তাঁর চমৎকার গোলটি নিয়ে জিজ্ঞেস করেন, ওলিসে মাত্র এক লাইনে উত্তর দিয়েছিলেন: “হ্যাঁ, বলটা আসলো, শট নিলাম, গোল হলো। ব্যস।”
মিডিয়ার সামনে মুখ খুললে যাঁর মুখ দিয়ে একটা বাক্য বের করাও কঠিন, সেই ওলিসে মাঠে নামলে প্রতিপক্ষের ডিফেন্সকে যেভাবে কচুকাটা করেন—তা দেখে ভক্তরা ভালোবেসে নাম দিয়েছেন “দ্য সাইলেন্ট অ্যাসাসিন”; মানে ভাই বাইরে একদম সাধু বাবা, কিন্তু মাঠে নামলে খাঁটি কসাই!
Reference:

