মাঠের লেফট-ব্যাক হয়েও দিনিয়ে যেভাবে তোয়ালে-পানি নিয়ে বার্সেলোনার রাস্তায় রিয়েল লাইফ সুপারম্যান সেজে মানুষের জান বাঁচিয়েছিলেন, তা দেখে তো স্বয়ং মার্ভেল কমিকসের হিরোরাও তাকে স্যালুট ঠুকেছিল!
ফরাসি ফুটবলের অন্যতম অভিজ্ঞ এবং ধারাবাহিক ডিফেন্ডার লুকাস দিনিয়ে। গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ইউরোপের শীর্ষ ফুটবল মঞ্চে ঠিক এই কাজটুকুই নিখুঁতভাবে করে আসছেন এই ফরাসি তারকা। পিএসজি, বার্সেলোনা, এভারটন থেকে শুরু করে বর্তমানের অ্যাস্টন ভিলা সবখানেই তিনি প্রমাণ করেছেন কেন তাকে ইউরোপীয় ফুটবলের অন্যতম বিশ্বস্ত উইং-গার্ড বলা হয়।
লুকাস দিনিয়ে- এর ব্যক্তিগত তথ্য:
|
নাম |
লুকাস দিনিয়ে |
|
জন্ম |
২০ জুলাই ১৯৯৩ (বয়স ৩২) |
|
জন্মস্থান |
মো , ফ্রান্স |
|
উচ্চতা |
১.৭৮ মিটার (৫ ফুট ১০ ইঞ্চি) |
|
পজিশন |
লেফট-ব্যাক |
|
ক্লাব ক্যারিয়ার |
লিল,পিএসজি,রোমা,বার্সেলোনা,এভারটন এবং বর্তমানে অ্যাস্টন ভিলা ক্লাবের হয়ে খেলছেন। |
|
আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার |
২০১৪– ফ্রান্স |

লুকাস দিনিয়ে ১৯৯৩ সালের ২০ জুলাই ফ্রান্সের মো শহরে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি তার ছিল সহজাত আকর্ষণ। তার ফুটবল যাত্রা শুরু হয় মাত্র ছয় বছর বয়সে, ১৯৯৯ সালে স্থানীয় ক্লাব মারেউইল-লে-মো-এর যুব একাডেমিতে। সেখানে তিন বছর কাটানোর পর ২০০২ সালে তিনি যোগ দেন ক্রেই-এর যুব দলে।
তবে দিনিয়ের ক্যারিয়ারের আসল ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় ২০০৫ সালে, যখন তিনি ফ্রান্সের বিখ্যাত ক্লাব লিল-এর যুব একাডেমিতে যোগ দেন। লিলের বিশ্বমানের একাডেমি দিনিয়েকে একজন পেশাদার ফুটবলার হওয়ার জন্য শারীরিকভাবে ও মানসিকভাবে গড়ে তোলে। লিলের বয়সভিত্তিক দলগুলোতে তার চমৎকার পারফরম্যান্স দেখে কোচ ও স্কাউটরা বুঝে গিয়েছিলেন যে, ফ্রান্স ফুটবলের ভবিষ্যৎ লেফট-ব্যাকের সন্ধান তারা পেয়ে গেছেন।
লিলের যুব একাডেমি থেকে চমৎকার পারফরম্যান্সের সুবাদে ২০১১ সালে দিনিয়েকে সিনিয়র দলে উন্নীত করা হয়। ২০১১ সালের ২৬ অক্টোবর কুপ দে লা লিগের ম্যাচে সেদানের বিরুদ্ধে লিলের হয়ে তার পেশাদার অভিষেক ঘটে। ২০১২-১৩ মৌসুমে তিনি লিলের নিয়মিত লেফট-ব্যাক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। লিলের হয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের মঞ্চেও তার অভিষেক হয় এই সময়েই। লিলের জার্সিতে মোট ৬০টি ম্যাচ খেলে তিনি ফরাসি ফুটবলের অন্যতম সেরা তরুণ ডিফেন্ডার হিসেবে লাইমলাইটে আসেন।
২০১৩ সালের জুলাই মাসে ফরাসি জায়ান্ট প্যারিস সেন্ট জার্মেই লুকাস দিনিয়েকে ৫ বছরের চুক্তিতে দলে ভেড়ায়। পিএসজিতে তখন একঝাঁক বিশ্বসেরা তারকার মেলা। সেখানে ব্রাজিলের অভিজ্ঞ লেফট-ব্যাক মাক্সওয়েলের উপস্থিতির কারণে দিনিয়েকে প্রথম একাদশের জন্য কঠিন লড়াই করতে হয়েছিল।

পিএসজিতে দুই মৌসুমে তিনি ৪৪টি ম্যাচ খেলেন এবং দলের হয়ে ব্যাক-টু-ব্যাক লিগ ১ শিরোপা, কুপ দে ফ্রান্স এবং কুপ দে লা লিগ জেতার স্বাদ পান। তবে নিয়মিত খেলার সুযোগ পাওয়ার জন্য তিনি ২০১৫-১৬ মৌসুমে ইতালিয়ান ক্লাব এএস রোমাতে ধারে যোগ দেন। ইতালিয়ান সিরি এ-তে রোমার হয়ে তিনি ৪২টি ম্যাচে ৩টি গোল করেন এবং নিজের চেনা ছন্দ ফিরে পান।
রোমায় দারুণ একটি মৌসুম কাটানোর পর ইউরোপের অন্যতম সেরা ক্লাব এফসি বার্সেলোনা দিনিয়ের দিকে নজর দেয়। ২০১৬ সালের জুলাই মাসে ১৬.৫ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে বার্সেলোনায় যোগ দেন তিনি।
ক্যাম্প ন্যু-তে দিনিয়ের মূল ভূমিকা ছিল জর্দি আলবার ব্যাক-আপ হিসেবে। তবে যখনই সুযোগ পেয়েছেন, তিনি বার্সার রক্ষণভাগে নিজের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছেন। বার্সেলোনার টিকিটাকা পাসিং স্টাইলের সাথে তিনি দ্রুত নিজেকে মানিয়ে নেন। বার্সার হয়ে তিনি ২০১৭-১৮ মৌসুমে লা লিগা এবং পরপর দুইবার কোপা দেল রে শিরোপা জেতেন।
বার্সেলোনায় জর্দি আলবার কারণে নিয়মিত স্টার্ট করতে না পারায় দিনিয়ে ২০১৮ সালের আগস্টে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব এভারটন-এ যোগ দেন। মার্সিসাইডের এই ক্লাবেই দিনিয়ে তার ক্যারিয়ারের সেরা ফুটবল খেলেন। কিংবদন্তি লেফট-ব্যাক লেটন বেইন্সের উত্তরসূরি হিসেবে এভারটন ভক্তরা তাকে লুফে নেয়।
প্রিমিয়ার লিগের প্রথম মৌসুমেই তিনি ক্লাবের “প্লেয়ার অব দ্য সিজন” নির্বাচিত হন। তার নিখুঁত ক্রস, ফ্রি-কিক থেকে সরাসরি গোল করার ক্ষমতা এবং কর্নার কিক নেওয়ার দক্ষতা এভারটনের আক্রমণের অন্যতম প্রধান অস্ত্র হয়ে ওঠে। এভারটনের হয়ে সাড়ে তিন মৌসুমে তিনি ১২৭টি ম্যাচ খেলেন এবং ৬টি গোল করার পাশাপাশি ২০টি অ্যাসিস্ট করেন।

২০২২ সালের জানুয়ারিতে প্রায় ২৫ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে দিনিয়ে অ্যাস্টন ভিলাতে যোগ দেন। ভিলা পার্কে আসার পর প্রথম দিকে কিছুটা চোটের সমস্যায় ভুগলেও, ম্যানেজার উনাই এমরির অধীনে তিনি ভিলার ট্যাকটিক্যাল প্ল্যানের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠেন।
২০২৩-২৪ এবং ২০২৪-২৫ মৌসুমে অ্যাস্টন ভিলার প্রিমিয়ার লিগের শীর্ষ চারে থাকা এবং চ্যাম্পিয়ন্স লিগে কোয়ালিফাই করার পেছনে দিনিয়ের অভিজ্ঞতা এবং রক্ষণাত্মক নিটোল পারফরম্যান্স দারুণ ভূমিকা পালন করে। অভিজ্ঞ এই ডিফেন্ডার ভিলার তরুণ ডিফেন্স লাইনকে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রেও বড় ভূমিকা রাখছেন।
লুকাস দিনিয়ে ফ্রান্সের বয়সভিত্তিক ফুটবলের প্রতিটি স্তরে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। ২০১৩ সালে পল পগবা, ফ্লোরিয়ান থোভিনদের সাথে মিলে তিনি ফ্রান্স অনূর্ধ্ব-২০ দলকে ফিফা অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ জেতাতে অন্যতম প্রধান ভূমিকা পালন করেন।
২০১৪ সালের মার্চ মাসে নেদারল্যান্ডসের বিরুদ্ধে ম্যাচে ফ্রান্সের মূল জাতীয় দলের হয়ে দিনিয়ের অভিষেক হয়। তৎকালীন কোচ দিদিয়ের দেশম তাকে ২০১৪ ফিফা বিশ্বকাপের স্কোয়াডে অন্তর্ভুক্ত করেন।

ফ্রান্স দলে থিও হার্নান্দেজ এবং ফেরল্যান্ড মেন্দির মতো বিশ্বমানের লেফট-ব্যাকদের সাথে তীব্র প্রতিযোগিতা থাকা সত্ত্বেও দিনিয়ে দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় দলের পুলে নিজের জায়গা ধরে রেখেছেন। দেশের হয়ে প্রায় ৫০টিরও বেশি ম্যাচ খেলা এই ডিফেন্ডার ফ্রান্সের ড্রেসিংরুমে একজন অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তিত্ব।
২০২৬ বিশ্বকাপটি লুকাস দিনিয়ের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের অন্যতম শেষ বড় আসর হতে যাচ্ছে, আর তাই ফ্রান্সের ড্রেসিংরুমে নিজের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে দলের ভারসাম্য ধরে রাখতে তিনি মুখিয়ে আছেন।
মাঠের বাইরে একজন অত্যন্ত পারিবারিক মানুষ। ২০১৪ সালে তিনি তার দীর্ঘদিনের প্রেমিকা টিজি দিরভিলেকে বিয়ে করেন। এই দম্পতির দুটি সন্তান রয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রায়শই তাকে পরিবারের সাথে সময় কাটানোর ছবিলুকাস দিনিয়ে শেয়ার করতে দেখা যায়।

২০১৭ সালে বার্সেলোনায় থাকার সময় এক সন্ত্রাসী হামলার পর দিনিয়ে স্তব্ধ হয়ে যাওয়া সাধারণ মানুষকে সাহায্য করতে রাস্তায় নেমে এসেছিলেন, যা তার মানবিক গুণাবলীর এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে সংবাদমাধ্যমে প্রশংসিত হয়েছিল।
Reference:

