স্পেন যখন লুকাসকে নিজেদের পাসপোর্ট গছিয়ে লাল-হলুদ জার্সি পরানোর স্বপ্নে বিভোর, ঠিক তখনই দিদিয়ের দেশম এসে ফরাসি বিরিয়ানির লোভ দেখিয়ে জলজ্যান্ত এক স্প্যানিশ ডিফেন্ডারকে ‘মেড ইন ফ্রান্স’ বানিয়ে দিলেন!
মারাত্মক ইনজুরিও যার জেদের কাছে হার মানে, ফুটবলের সেই আসল যুদ্ধক্ষেত্রের সৈনিকের নাম লুকাস হার্নান্দেজ! মাঠের ভেতরে রক্তক্ষয়ী ট্যাকল আর মাঠের বাইরে কঠিন জীবনযুদ্ধের গল্প নিয়ে বড় হওয়া ফ্রান্সের এই বিশ্বজয়ী ডিফেন্ডারের অবিশ্বাস্য কাহিনী আজ শুনবো।
লুকাস হার্নান্দেজ- এর ব্যক্তিগত তথ্য:
| নাম |
লুকাস ফ্রাঁসোয়া বার্নার্ড হার্নান্দেজ |
|
জন্ম |
১৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬ (বয়স ৩০) |
|
জন্মস্থান |
মার্সেই , ফ্রান্স |
|
উচ্চতা |
১.৮৪ মিটার (৬ ফুট ০ ইঞ্চি) |
|
পজিশন |
সেন্টার-ব্যাক / লেফট-ব্যাক |
|
ক্লাব ক্যারিয়ার |
অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ,বায়ার্ন মিউনিখ এবং বর্তমানে প্যারিস সেন্ট-জার্মেইন ক্লাবের হয়ে খেলছেন। |
|
আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার |
২০১৮– ফ্রান্স |

লুকাস হার্নান্দেজ ১৯৯৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ফ্রান্সের মার্সেই শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর রক্তেই ছিল ফুটবল, কারণ তাঁর বাবা জঁ-ফ্রাঁসোয়া হার্নান্দেজও একজন পেশাদার ফুটবলার ছিলেন যিনি অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের হয়ে খেলেছেন। লুকাসের ছোট ভাই থিও হার্নান্দেজও বর্তমান ফুটবল বিশ্বের অন্যতম সেরা লেফট-ব্যাক।
শৈশবেই লুকাসের বাবা পরিবার ছেড়ে চলে যান, যার ফলে মা লরেন্স পিয়ের একা হাতে দুই ভাইকে বড় করেন। মাত্র চার বছর বয়সে লুকাস স্পেনে চলে আসেন। ২০০৭ সালে, ১১ বছর বয়সে তিনি তাঁর ভাই থিওর সাথে স্প্যানিশ ক্লাব অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের বিখ্যাত যুব অ্যাকাডেমিতে যোগ দেন।
অ্যাটলেটিকোর যুব দল থেকে দারুণ পারফরম্যান্সের পর ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে লুকাসের মূল দলে অভিষেক হয়। কোচ ডিয়েগো সিমিওনের অধীনে ডিফেন্সের কঠিন পাঠ নেন তিনি। সিমিওনের আগ্রাসী এবং শারীরিক ফুটবল দর্শনের সাথে লুকাস নিজেকে দারুণভাবে খাপ খাইয়ে নেন।

অ্যাটলেটিকোর হয়ে তিনি গডিন এবং সাভিচের মতো অভিজ্ঞ ডিফেন্ডারদের সাথে জুটি বেঁধে ইউরোপের অন্যতম সেরা ডিফেন্স লাইন গড়ে তোলেন। ২০১৬ সালের চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে তিনি বদলি হিসেবে মাঠে নেমেছিলেন। ২০১৮ সালে অ্যাটলেটিকোর হয়ে তিনি উয়েফা ইউরোপা লিগ এবং উয়েফা সুপার কাপ জয় করেন। স্প্যানিশ ক্লাবটির হয়ে তিনি ১১০টি ম্যাচ খেলেন।
২০১৯ সালের মার্চে জার্মান জায়ান্ট বায়ার্ন মিউনিখ ক্লাব ইতিহাসের রেকর্ড ৮০ মিলিয়ন ইউরোর রিলিজ ক্লজ দিয়ে লুকাস হার্নান্দেজকে দলে ভেড়ায়। তৎকালীন সময়ে তিনি ছিলেন বুন্দেসলিগার ইতিহাসের সবচেয়ে দামি খেলোয়াড়।
মিউনিখে লুকাসের শুরুটা ইনজুরির কারণে কিছুটা বাধাগ্রস্ত হলেও, মাঠে যখনই নামতেন তিনি নিজের সেরাটা উজাড় করে দিতেন। ২০১৯-২০ মৌসুমে বায়ার্নের ঐতিহাসিক ‘ট্রিপল’ জয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বায়ার্নে কাটানো চার মৌসুমে তিনি ৪টি বুন্দেসলিগা শিরোপাসহ মোট ১০টি ট্রফি জেতেন। তবে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে এসিএল ইনজুরির কারণে বায়ার্নের হয়ে তাঁর শেষ মৌসুমটি মাঠের বাইরেই কাটে।

২০২৩ সালের জুলাই মাসে লুকাস তাঁর মাতৃভূমি ফ্রান্সে ফিরে আসেন এবং ৪৫ মিলিয়ন ইউরোর চুক্তিতে পিএসজিতে যোগ দেন। পিএসজিতে এসে তিনি দ্রুতই লুইস এনরিকের দলের অন্যতম নির্ভরযোগ্য ডিফেন্ডার হয়ে ওঠেন। তবে ২০২৪ সালের মে মাসে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সেমিফাইনালের প্রথম লেগে বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের বিপক্ষে আবারও তাঁর বাম পায়ের এসিএল ছিঁড়ে যায়। এই মারাত্মক ইনজুরি কাটিয়ে ২০২৫-২৬ মৌসুমে তিনি পুনরায় পিএসজির রক্ষণভাগে ফিরে এসেছেন এবং দলের ট্রফি জয়ে অবদান রাখছেন।
লুকাস হার্নান্দেজ স্পেনে বড় হওয়ায় স্প্যানিশ জাতীয় দলের হয়ে খেলার প্রস্তাব পেয়েছিলেন। তবে ২০১৮ সালের মার্চে ফ্রান্সের কোচ দিদিয়ের দেশম তাঁকে ফ্রান্সের মূল দলে ডাকলে তিনি নিজের জন্মভূমিকেই বেছে নেন।
২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপে লুকাস হার্নান্দেজ ছিলেন ফ্রান্সের লেফট-ব্যাক পজিশনের প্রথম পছন্দ। পুরো টুর্নামেন্টে তাঁর পারফরম্যান্স ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে দ্বিতীয় রাউন্ডের ম্যাচে বেঞ্জামিন পাভার্ডের সেই বিখ্যাত গোলের অ্যাসিস্টটি করেছিলেন লুকাস। ফাইনালে ক্রোয়েশিয়াকে ৪-২ গোলে হারিয়ে ফ্রান্স যখন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়, কিলিয়ান এমবাপের গোলের পেছনেও ছিল লুকাসের নিখুঁত পাস। পুরো টুর্নামেন্টে অসাধারণ ডিফেন্ডিং ও ২টি অ্যাসিস্ট করে তিনি বিশ্বমঞ্চে নিজের নাম খোদাই করেন।

২০২১ সালের উয়েফা নেশনস লিগের সেমিফাইনালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে লুকাস এবং তাঁর ছোট ভাই থিও হার্নান্দেজ একসাথে ফ্রান্সের হয়ে মাঠে নামেন। ১৯৭৪ সালের পর এই প্রথম কোনো দুই ভাই একসাথে ফ্রান্স দলের হয়ে খেলেন। সেই টুর্নামেন্টের ফাইনালে স্পেনকে হারিয়ে ফ্রান্স চ্যাম্পিয়ন হয়।
তবে ইনজুরি তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের বড় শত্রু। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে মাত্র ১৩ মিনিটের মাথায় তাঁর এসিএল ইনজুরি হয়, যার ফলে পুরো টুর্নামেন্ট থেকে তিনি ছিটকে যান ।
২০২৪ সালের মে মাসে পিএসজির হয়ে খেলার সময় এসিএল ইনজুরিতে পড়ার কারণে লুকাস হার্নান্দেজ ইউরো ২০২৪ মিস করেছিলেন। তবে সব বাধা কাটিয়ে তিনি মাঠে ফিরেছেন এবং ২০২৬ সালের কোচ দিদিয়ের দেশম ঘোষিত ফ্রান্সের ২৬ সদস্যের ২০২৬ বিশ্বকাপ স্কোয়াডে নিজের জায়গা নিশ্চিত করেছেন।
২০১৮ বিশ্বকাপজয়ী ফ্রান্স দলের যে মাত্র চারজন খেলোয়াড় এই ২০২৬-এর স্কোয়াডে টিকে আছেন, লুকাস তাদের একজন । ড্রেসিংরুমে তার উপস্থিতি এবং লিডারশিপ ফ্রান্স দলের তরুণ ডিফেন্ডারদের জন্য বড় টনিক হিসেবে কাজ করবে। ফ্রান্স দলের হয়ে গ্রুপ পর্বে সেনেগাল, ইরাক এবং নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচগুলোতে লুকাস হার্নান্দেজের ডিফেন্সিভ সলিডিটি দলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে যাচ্ছে।
Reference:
- https://en.wikipedia.org/wiki/Lucas_Hernandez
- https://bn.wikipedia.org/wiki/%E0%A6%B2%E0%A7%81%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%B8_%E0%A6%8F%E0%A6%B0%E0%A6%A8%E0%A6%81%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%9C
- https://www.transfermarkt.com/lucas-hernandez/leistungsdaten/spieler/281963
- https://www.psg.fr/en/players/lucas-hernandez
- https://www.espn.com/soccer/player/_/id/196200/lucas-hernandez

