দানিলোর ট্রফি ভাগ্য এতোটাই স্ট্রং যে, তিনি মাঠে ডিফেন্স না দিয়ে সাইডবেঞ্চে বসে স্রেফ পপকর্ন খেলেও ট্রফিগুলো নিজে হেঁটে এসে তাঁর ক্যাবিনেটে ঢুকে পড়বে!xa0
সান্তিয়াগো বার্নাব্যুর গ্যালারি থেকে ধেয়ে আসা দুয়ো কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নির্মম ট্রল কোনো কিছুই দমাতে পারেনি তাঁর অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে। তিনি দানিলো; যিনি মাঠে ফ্যান্সি ফুটবল খেলেন না, কিন্তু দলের প্রয়োজনে নিজের সবটুকু উজাড় করে দিতে কখনো কার্পণ্য করেন না। রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয় থেকে শুরু করে জুভেন্টাস এবং ব্রাজিল জাতীয় দলের অধিনায়কের আর্মব্যান্ড হাতে নেওয়া এক অবমূল্যায়িত যোদ্ধার রাজকীয় ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প।
দানিলো লুইজ দা সিলভা- এর ব্যক্তিগত তথ্য:
|
নামxa0 |
দানিলো লুইজ দা সিলভা |
|
জন্ম xa0 |
১৫ জুলাই ১৯৯১ (বয়স ৩৪) |
|
জন্মস্থানxa0 |
বিকাস , মিনাস গেরাইস , ব্রাজিল |
|
উচ্চতাxa0 |
১.৮৪ মিটার (৬ ফুট ০ ইঞ্চি) |
|
পজিশনxa0 |
সেন্টার-ব্যাক * রাইট-ব্যাক |
|
ক্লাব ক্যারিয়ার |
আমেরিকা মিনেরো, সান্তোস, পোর্তো, রিয়াল মাদ্রিদ, ম্যানচেস্টার সিটি, জুভেন্টাস এবং ফ্লামেঙ্গো ক্লাবের হয়ে খেলেছেন। |
|
আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার |
২০১১– ব্রাজিল |

১৯৯১ সালের ১৫ জুলাই ব্রাজিলের মিনাস জেরাইসের বিকাস নামক একটি ছোট শহরে জন্ম নেন দানিলো লুইজ দা সিলভা। ব্রাজিলের আর দশটা সাধারণ ছেলের মতোই ফুটবল ছিল তাঁর বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। ১২ বছর বয়সে তিনি স্থানীয় ক্লাব আমেরিকা মিনেইরোর যুব একাডেমিতে যোগ দেন। সেখানে নিজের কঠোর পরিশ্রম এবং ডিফেন্সিভ ট্যাকলের ক্ষমতার কারণে দ্রুতই নজর কাড়েন। ২০১০ সালে তিনি ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব সান্তোসে যোগ দেন, যা তাঁর ক্যারিয়ারের প্রথম বড় টার্নিং পয়েন্ট।
সান্তোসে দানিলো এমন এক সময়ে যোগ দিয়েছিলেন যখন ক্লাবটিতে নেইমার জুনিয়র এবং গানসোর মতো তরুণ প্রতিভারা বিশ্ব ফুটবলে ঝড় তুলছেন। ২০১১ সালের কোপালিবার্তোদোরেস জয় ছিল সান্তোসের ইতিহাসের অন্যতম সেরা সাফল্য। সেই টুর্নামেন্টের ফাইনালে পেনিয়ারোলের বিরুদ্ধে জয়সূচক ও ঐতিহাসিক গোলটি করেছিলেন রাইট-ব্যাক পজিশনে খেলা দানিলো। সান্তোসের হয়ে তাঁর এই অলরাউন্ড পারফরম্যান্স ইউরোপের বড় বড় ক্লাবগুলোর স্কাউটদের বাধ্য করে ব্রাজিলে চোখ রাখতে।
২০১২ সালের জানুয়ারিতে ১৩ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে পর্তুগিজ জায়ান্ট এফসি পোর্তোতে যোগ দেন দানিলো। পোর্তোকে বলা হয় ইউরোপীয় ফুটবলের ‘ট্যালেন্ট ফ্যাক্টরি’। সেখানে গিয়ে দানিলো তাঁর খেলার ধার আরও বাড়িয়ে নেন। পোর্তোর হয়ে ১৪১ ম্যাচে ১৩টি গোল করে তিনি নিজেকে ইউরোপের অন্যতম সেরা রাইট-ব্যাক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।

২০১৫ সালে ৩১.৫ মিলিয়ন ইউরোর চড়া মূল্যে সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে পা রাখেন দানিলো। রিয়াল মাদ্রিদে তাঁর আগমনটা সহজ ছিল না। সেই সময়ে রাইট-ব্যাক পজিশনে দানি কারভাহাল ছিলেন তাঁর চরম ফর্মে। কারভাহালের ব্যাক-আপ হিসেবে বা কারভাহাল চোটাক্রান্ত হলে দানিলোকে মাঠে নামানো হতো।
রিয়াল মাদ্রিদের মতো ক্লাবে সমর্থকদের প্রত্যাশার চাপ থাকে আকাশচুম্বী। কয়েকটি ম্যাচে ছোটখাটো ভুলের কারণে সান্তিয়াগো বার্নাব্যুর সমর্থকরা দানিলোকে দুয়ো দিতে শুরু করে। তবে মানসিক শক্তির দিক থেকে দানিলো দমে যাননি। জিনেদিন জিদানের অধীনে রিয়াল মাদ্রিদের বিখ্যাত টানা দুটি ওয়ান-টু-ম্যান চ্যাম্পিয়ন্স লিগ এবং লা লিগা জয়ী স্কোয়াডের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন তিনি। চোট জর্জরিত কারভাহালের অনুপস্থিতিতে অনেক বড় ম্যাচে দানিলো রিয়ালের রক্ষণভাগকে আগলে রেখেছিলেন।
২০১৭ সালে ২৬.৫ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব ম্যানচেস্টার সিটিতে যোগ দেন দানিলো। পেপ গার্দিওলার মতো একজন মাস্টারমাইন্ড কোচ দানিলোর বহুমুখী প্রতিভা বুঝতে পেরেছিলেন। সিটিতে তিনি শুধু রাইট-ব্যাক হিসেবে নন, প্রয়োজনে লেফট-ব্যাক এবং ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবেও খেলেছেন। সিটিতে দুই মৌসুমে তিনি টানা দুটি প্রিমিয়ার লিগ, একটি এফএ কাপ এবং দুটি লিগ কাপ জেতেন। গার্দিওলার অধীনে দানিলো ফুটবলের স্ট্রাকচারাল ও ট্যাকটিক্যাল জ্ঞান আরও গভীরভাবে রপ্ত করেন।
২০১৯ সালের আগস্টে দানিলো ইতালিয়ান ক্লাব জুভেন্টাসে যোগ দেন। ইতালিয়ান ফুটবল বরাবরই ডিফেন্ডারদের জন্য কঠিন পরীক্ষা। আর এই ইতালিতে এসেই দানিলো তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে পরিপক্ব রূপটি দেখান।

জুভেন্টাসের ড্রেসিংরুমে জর্জিও কিয়েলিনি এবং লিওনার্দো বোনুচ্চির মতো কিংবদন্তি ডিফেন্ডারদের বিদায়ের পর নেতৃত্বের ব্যাটন ওঠে দানিলোর হাতে। জুভেন্টাসের হয়ে তিনি সিরি এ এবং কোপা ইতালিয়া জিতেছেন এবং বর্তমান ২০২৫-২৬ মৌসুমেও দলের রক্ষণভাগের মূল ভরসা হিসেবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
২০১১ সালে ব্রাজিলের জাতীয় দলে অভিষেক হয় দানিলোর। দানি আলভেসের মতো কিংবদন্তির উপস্থিতির কারণে শুরুতে জাতীয় দলে নিয়মিত হওয়া কঠিন ছিল। তবে ২০১৮ এবং ২০২২ বিশ্বকাপে দানিলো ছিলেন ব্রাজিলের রক্ষণভাগের মূল ডিফেন্ডার।
ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর মেগা মঞ্চে ব্রাজিল যখন তাদের বহুল প্রতীক্ষিত ‘হেক্সা’ মিশনের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত, তখন তরুণ ও ঝাঁঝালো স্কোয়াডের পেছনে অভিজ্ঞতার নোঙর ফেলছেন দলের অধিনায়ক এবং রক্ষণভাগের প্রধান স্তম্ভ দানিলো। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, রদ্রিগো বা এনদ্রিকেদের নিয়ে গড়া ব্রাজিলের আক্রমণভাগ যতটাই হাইপ আর গ্ল্যামারে ঠাসা, দানিলোর নেতৃত্বাধীন ডিফেন্স লাইনটি ঠিক ততটাই শান্ত, সুশৃঙ্খল এবং নিখুঁত। ৩৪ বছর বয়সী এই জুভেন্টাস ডিফেন্ডারই এবার সেলেসাওদের মাঠের ভেতরের আসল চালিকাশক্তি।xa0
Reference:

