Image default
কুয়েতপর্যটন আকর্ষণ

সুক আল-মুবারাকিয়া ও প্রাচীন আরবের রূপকথা

নিজের পছন্দে কাঁচা মাছ কিনে পাশের দোকানে দিলে তারা চোখের সামনেই বারবিকিউ করে দেয় যেন ‘মাছ ধরব না, তবে বাজার থেকে কিনে এনেই একদম টাটকা পুড়িয়ে খাব’ টাইপ রাজকীয় কারবার!

তেলের খনি আবিষ্কারের অনেক আগে থেকেই পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান হাব ছিল কুয়েতের ঐতিহাসিক সুক আল-মুবারাকিয়া। ১৮৯৭ সালে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাওয়া এই প্রাচীন বাজারটি কেবল কেনাকাটার স্থান নয়, বরং কুয়েতের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং ঘুরে দাঁড়ানোর এক জীবন্ত দলিল।

এক নজরে সুক আল-মুবারাকিয়া

বিষয় বিবরণ
বয়স ২০০ বছরেরও বেশি পুরোনো
নামকরণ শেখ মুবারক আল-সাবাহ-এর নামানুসারে
মূল আকর্ষণ আতর, সোনা, খেজুর, মসলা এবং ঐতিহ্যবাহী খাবার
বিশেষত্ব কুয়েতের টিকে থাকা একমাত্র প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী উন্মুক্ত বাজার
সুক আল-মুবারাকিয়া – Image Source:vanakkamgulf.com

সুক আল-মুবারাকিয়ার ইতিহাস

সুক আল-মুবারাকিয়ার ইতিহাস শুরু হয়েছিল আজ থেকে প্রায় দুই শতাব্দীরও বেশি সময় আগে, যখন কুয়েত আজকের মতো তেলসমৃদ্ধ ধনী দেশ ছিল না। সে সময় কুয়েতের অর্থনীতি গড়ে উঠেছিল মূলত মুক্তা শিকার, সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং পশুপালনকে কেন্দ্র করে। এই বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে ১৮৯৭ সালে বাজারটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে শুরু করে।

বাজারটির নামকরণ করা হয়েছে কুয়েতের তৎকালীন মহান শাসক শেখ মুবারক আল-সাবাহ-এর নামানুসারে, যাঁকে আধুনিক কুয়েতের প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়। তিনি এই বাজারে বসে সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের কথা শুনতেন এবং বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। তেলের খনি আবিষ্কারের আগে এই বাজারটিই ছিল পুরো পারস্য উপসাগরীয় (Gulf) অঞ্চলের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক হাব, যেখানে ইরাক, ইরান, ভারত এবং সৌদি আরব থেকে বণিকরা উটের পিঠে ও জাহাজে করে মালামাল নিয়ে আসতেন।

সুক আল-মুবারাকিয়ার স্থাপত্যশৈলী

সুক আল-মুবারাকিয়া স্থাপত্যশৈলী – Image Source:www.tripadvisor.com

সুক আল-মুবারাকিয়ায় পা রাখামাত্রই আপনার মনে হবে আপনি কোনো টাইম মেশিনে চড়ে কয়েকশ বছর অতীতে চলে এসেছেন। চারপাশের আধুনিক বহুতল ভবনের মাঝে এই বাজারটিকে তার পুরোনো রূপেই সংরক্ষণ করা হয়েছে।

ঐতিহ্যবাহী ছাদ ও খুঁটি

বাজারের গলিগুলোর ওপর কাঠের তৈরি ঐতিহ্যবাহী ছাদ বা শেড রয়েছে, যা তীব্র রোদের মাঝেও ভেতরের পরিবেশকে শীতল রাখে। এর কাঠের খুঁটি এবং মাটির রঙের দেওয়ালে প্রাচীন আরব্য স্থাপত্যের নিখুঁত ছোঁয়া পাওয়া যায়।

সরু গলির গোলকধাঁধা

বাজারটি কোনো সুনির্দিষ্ট প্ল্যানে তৈরি আধুনিক মলের মতো নয়। এটি ছোট ছোট অসংখ্য সরু গলির একটি গোলকধাঁধা। প্রতিটি গলি একটি নির্দিষ্ট পণ্যের জন্য বিখ্যাত। এক গলি থেকে অন্য গলিতে হাঁটার সময় বাতাসে ভেসে আসা সুগন্ধি আর মসলার ঘ্রাণ এক অদ্ভুত মায়াবী পরিবেশ তৈরি করে।

সুক আল-মুবারাকিয়ার প্রধান আকর্ষণসমূহ

বিশাল এই ঐতিহ্যবাহী বাজারটিকে কয়েকটি প্রধান অংশে ভাগ করা হয়েছে, যার প্রতিটি অংশ আপনাকে সম্পূর্ণ নতুন এক অভিজ্ঞতা দেবে:

পারফিউম ও আতরের গলি

আরবদের সুগন্ধিপ্রীতির কথা বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। এই বাজারে রয়েছে খাঁটি আরব্য আতর, ঊদ (Oudh), কস্তুরী (Musk) এবং বখুরের (এক ধরনের সুগন্ধি ধূপ) বিশাল কালেকশন। এখানে আপনি আপনার পছন্দ অনুযায়ী বিভিন্ন সুগন্ধি মিশিয়ে নিজস্ব কাস্টমাইজড পারফিউম তৈরি করে নিতে পারবেন।

সুক আল-মুবারাকিয়া পারফিউম ও আতরের গলি – Image Source:thelandofwanderlust.com

সোনা ও গহনার বাজার

আরব্য ডিজাইনের ভারী ও নিখুঁত সোনার গহনা কিনতে চাইলে সুক আল-মুবারাকিয়ার গোল্ড সুকের কোনো বিকল্প নেই। এখানকার দোকানগুলোর আলো ঝলমলে ডিসপ্লেতে থাকা ঐতিহ্যবাহী কুয়েতি ডিজাইনের গহনাগুলো দর্শনার্থীদের চোখ ধাঁধিয়ে দেয়।

মসলা ও খেজুরের সমাহার

এই অংশে প্রবেশ করলেই আপনার নাসিকারন্ধ্র তাজা মসলার কড়া ঘ্রাণে ভরে উঠবে। ইরান, ভারত ও ওমান থেকে আসা জাফরান, এলাচ, দারুচিনিসহ শত পদের মসলা এখানে পাওয়া যায়। এর ঠিক পাশেই রয়েছে খেজুরের বাজার, যেখানে বিশ্বের সেরা আজওয়া, মরিয়ম, সুক্কারি এবং চকোলেট ও বাদাম মিশ্রিত রাজকীয় খেজুরের স্তূপ সাজানো থাকে।

ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও কার্পেট

কুয়েতিদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক ‘ডিশডাশা’ (পুরুষদের সাদা পোশাক) এবং নারীদের নকশা করা ‘আবায়া’র জন্য এই বাজার বিখ্যাত। এছাড়া ইরান ও আফগানিস্তান থেকে আসা হাতে বোনা পার্সিয়ান কার্পেটের দোকানগুলো বাজারের সৌন্দর্য বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

ঐতিহ্যবাহী কুয়েতি স্বাদ

কেনাকাটার চেয়েও সুক আল-মুবারাকিয়ার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো এর উন্মুক্ত খাবার চত্বর বা ডাইনিং এরিয়া। কেনাকাটা শেষে সন্ধ্যায় স্থানীয় মানুষ ও পর্যটকরা এখানে এসে টেবিল পেতে বসেন।

এখানে আপনি পাবেন কুয়েতের ঐতিহ্যবাহী খাবার মাছবুস’ যা চাল ও মাংসের এক চমৎকার সুগন্ধি মিশ্রণ। এছাড়া কয়লার আগুনে পোড়ানো তাজা ইরানি কাবাব, টার্কিশ গ্রিল, তাজা সামুদ্রিক মাছ ভাজা এবং আরব্য রুটি ‘খুবুজ’-এর স্বাদ মুখে লেগে থাকার মতো। খাওয়া শেষে পুদিনা পাতা দেওয়া গরম আরব্য লাল চা কিংবা কড়া ‘গাহওয়া’ পানের মাধ্যমে আড্ডা জমানো এখানকার শত বছরের পুরনো কালচার।

যুদ্ধ এবং আগুনের ক্ষত পেরিয়ে পুনরুত্থান

সুক আল-মুবারাকিয়া কেবল আনন্দের জায়গা নয়, এটি কুয়েতের মানুষের দুঃখ এবং ঘুরে দাঁড়ানোর ইতিহাসেরও অংশ। ১৯৯০ সালে সংঘটিত উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় ইরাকি বাহিনীর আক্রমণে এই বাজারের একটি বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। যুদ্ধ শেষে কুয়েত সরকার অত্যন্ত যত্ন সহকারে এর ঐতিহাসিক নকশা অক্ষুণ্ণ রেখে বাজারটি পুনর্নির্মাণ করে।

সুক আল-মুবারাকিয়া আগুনের ক্ষত – Image Source:kuwaittimes.com

এমনকি অতি সম্প্রতি, ২০২২ সালেও একটি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে এই বাজারের বেশ কিছু পুরোনো দোকান পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল, যা পুরো কুয়েতবাসীকে গভীরভাবে শোকাহত করে। কিন্তু ঐতিহ্যপ্রেমী কুয়েতিরা বারবার তাদের এই প্রিয় বাজারকে ধ্বংসস্তূপ থেকে নতুন করে বাঁচিয়ে তুলেছে, যা তাদের অদম্য মানসিকতার পরিচয় দেয়।

উপসংহার

দ্য অ্যাভিনিউস মল যদি হয় কুয়েতের আধুনিক ও বিলাসবহুল ‘দেহ’, তবে সুক আল-মুবারাকিয়া হলো কুয়েতের আসল ‘আত্মা’। এটি এমন এক মিলনমেলা যেখানে একজন সাধারণ প্রবাসী শ্রমিক থেকে শুরু করে রাজপরিবারের সদস্য—সবাই একই ছাদের নিচে, একই বেঞ্চে বসে কফি খান।

‘সুক আল-মুবারাকিয়া’ নিয়ে কিছু চমৎকার ও অজানা তথ্য

১. আজকের যুগে শপিং মল মানেই বিশাল সব এসি বা এয়ার কন্ডিশনার। কিন্তু সুক আল-মুবারাকিয়া যখন তৈরি হয়, তখন এসির কোনো অস্তিত্বই ছিল না। তীব্র মরুভূমির গরম থেকে বাঁচতে এই বাজারের গলিগুলো অত্যন্ত সরু করে তৈরি করা হয়েছিল এবং ওপরে দেওয়া হয়েছিল বিশেষ কাঠের ছাদ। স্থাপত্যের এই চতুর কৌশলের কারণে সরাসরি সূর্যের আলো নিচে পৌঁছাতে পারে না এবং বাজারের ভেতর দিয়ে সবসময় একটি প্রাকৃতিক ঠান্ডা বাতাস প্রবাহিত হয়। ফলে তীব্র গরমেও এখানে হাঁটা বেশ আরামদায়ক।

২. সুক আল-মুবারাকিয়া কেবল একটি বাজার ছিল না, এটি ছিল আধুনিক কুয়েত রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কেন্দ্রবিন্দু। কুয়েতের ইতিহাসের প্রথম পোস্ট অফিস এবং প্রথম বাণিজ্যিক ব্যাংক উভয়ই এই বাজারের চত্বরেই প্রথম যাত্রা শুরু করেছিল।

৩. আরব দেশগুলোতে সাধারণত রাজপরিবারের সদস্য এবং সাধারণ মানুষের লাইফস্টাইলে আকাশ-পাতাল তফাত থাকে। কিন্তু সুক আল-মুবারাকিয়া এমন এক জাদুকরী জায়গা যেখানে সব ভেদাভেদ মুছে যায়। কুয়েতের আমির বা রাজপরিবারের সদস্যরাও প্রায়ই কোনো প্রোটোকল বা জাঁকজমক ছাড়াই সাধারণ মানুষের মতো এই বাজারের ওপেন-এয়ার রেস্তোরাঁয় এসে প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে কাবাব ও আরব্য কফি উপভোগ করেন।

৪. এই বাজারের ফিশ মার্কেট বা মাছের বাজারে একটি দারুণ নিয়ম রয়েছে। আপনি পুরো বাজার ঘুরে নিজের পছন্দমতো একদম তাজা সামুদ্রিক মাছ দরদাম করে কিনবেন। তারপর সেই কাঁচা মাছ নিয়ে পাশের যেকোনো ঐতিহ্যবাহী রেস্তোরাঁয় দিলে তারা সামান্য কিছু টাকার বিনিময়ে আপনার চোখের সামনেই কয়লার আগুনে চমৎকার মসলা দিয়ে সেটি বারবিকিউ বা ফ্রাই করে দেবে! এই ‘লাইভ কুকিং’ অভিজ্ঞতা পর্যটকদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।

৫. বাজারের ঠিক মাঝখানে কুয়েতের মহান শাসক শেখ মুবারক আল-সাবাহ-এর ঐতিহাসিক ‘দিওয়ানিয়া’ এখনো সংরক্ষিত আছে। আজ থেকে এক শতাব্দীরও বেশি সময় আগে তিনি প্রতিদিন এই বাজারের দিওয়ানিয়াতে এসে বসতেন, যেখানে দেশের যেকোনো সাধারণ নাগরিক সরাসরি এসে শাসকের সাথে দেখা করে তাদের সমস্যা বা নালিশ জানাতে পারতেন।

Reference:

 

 

Related posts

ক্যাসেল হিল: নিস শহরের আকাশছোঁয়া হৃদপিণ্ড

আশা রহমান

অটোমান সাম্রাজ্যের জীবন্ত অধ্যায় তোপকাপি প্রাসাদ !

স্প্যানিশদের তৈরি শতবর্ষী দুর্গ ফোর্ট অফ সান্টা ক্রুজ

আশা রহমান

Leave a Comment

Table of Contents

    This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More