সকালে ঘুম থেকে উঠে ক্রাশের ‘গুড মর্নিং’ টেক্সট পান আর না পান, এই হোটেলের জানালা খুললেই কিউট ডলফিনগুলো আপনাকে লেজ নেড়ে ফ্রিতে ‘গুড মর্নিং’ জানিয়ে দেবে!xa0
একপাশে সমুদ্রের পানির ওপর দিয়ে ঘণ্টায় ৭৫ কিলোমিটার বেগে ছুটে চলা বুক কাঁপানো রোলার কোস্টার, আর অন্যপাশে কাচের ওপারে কিউট ডলফিন আর বেলুগা তিমির জাদুকরী দুনিয়া! যেখানে দ্বীপে ঢোকার জন্য কোনো টিকিটই লাগে না। স্বাগতম জাপানের টোকিও উপসাগরে গড়ে ওঠা এক অবিশ্বাস্য জলজ স্বর্গরাজ্য হাক্কেইজিমা সি প্যারাডাইসে!xa0

জাপানের অন্যতম জনপ্রিয় বিনোদন পার্ক হলো “হাক্কেইজিমা সি প্যারাডাইস”। এটি কেবল একটি সাধারণ অ্যামিউজমেন্ট পার্ক বা অ্যাকোয়ারিয়াম নয়; এটি হলো টোকিও উপসাগরের একটি কৃত্রিম দ্বীপে গড়ে ওঠা বিশাল এক জলজ স্বর্গরাজ্য।xa0
১৯৯৩ সালের মে মাসে যাত্রা শুরু করা এই থিম পার্কটি ২৪ হেক্টরেরও বেশি জায়গা জুড়ে বিস্তৃত। এখানে একদিকে যেমন রয়েছে জাপানের অন্যতম বৃহত্তম অ্যাকোয়ারিয়াম কমপ্লেক্স, অন্যদিকে রয়েছে বুক কাঁপানো সব রাইড সমৃদ্ধ একটি থিম পার্ক। সব মিলিয়ে পরিবার, বন্ধু বা প্রিয়জনকে নিয়ে ছুটির দিন কাটানোর জন্য এটি একটি আদর্শ স্থান।xa0
হাক্কেইজিমা সি প্যারাডাইস এর মূল প্রাণ হলো এর অ্যাকোয়া রিসোর্টস। এটি মূলত চারটি ভিন্ন ভিন্ন অ্যাকোয়ারিয়াম এবং ইন্টারঅ্যাক্টিভ জোন নিয়ে গঠিত, যেখানে প্রায় ৫০০ প্রজাতির এক লাখেরও বেশি সামুদ্রিক জীব বসবাস করে।
অ্যাকোয়া মিউজিয়াম
এটি পার্কের প্রধান এবং সবচেয়ে বড় অ্যাকোয়ারিয়াম ভবন। মিউজিয়ামের প্রধান ভবনটি দূর থেকে দেখলে মনে হবে যেন সমুদ্রের বুকে এক আধুনিক, কাচ ও কংক্রিটের তৈরি পিরামিড মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, যা প্রথম দেখাতেই যেকোনো পর্যটকের নজর কাড়তে বাধ্য!xa0
এই মিউজিয়ামের মূল আকর্ষণ হলো একটি বিশাল তিনতলা উচ্চতার জলজ ট্যাংক, যেখানে হাজার হাজার রূপালী সার্ডিন মাছের ঝাঁক দলবেঁধে ঘোরে। তাদের এই সিনক্রোনাইজড মুভমেন্টের সাথে যখন রঙিন লাইট ও মিউজিক বাজানো হয়, তখন এক জাদুকরী পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
এই ভবনের ওপরের তলায় একটি বিশাল ওপেন-এয়ার স্টেডিয়াম রয়েছে, যেখানে ডলফিন, সি লায়ন এবং পেঙ্গুইনদের বুদ্ধিমত্তার খেলা দেখানো হয়। এই শো-টি দেখার জন্য সবসময় দর্শকদের উপচে পড়া ভিড় থাকে।

ডলফিন ফ্যান্টাসিxa0
ডলফিন প্রেমীদের জন্য এটি একটি অবাস্তব সুন্দর জায়গা। এটি একটি খিলান আকৃতির টানেল অ্যাকোয়ারিয়াম। আপনি যখন এই কাচের টানেলের ভেতর দিয়ে হাঁটবেন, তখন আপনার মাথার ওপর দিয়ে এবং চারপাশ দিয়ে ডলফিনগুলো মনের আনন্দে সাঁতার কেটে বেড়াবে। কৃত্রিম ছাদ না থাকায় সূর্যের আলো সরাসরি পানির ভেতর এসে পড়ে, যা ডলফিনগুলোর সাঁতার কাটার দৃশ্যকে আরও মায়াবী করে তোলে।

ফুয়ালু রিভেন্দাxa0
এই জোনের মূল থিম হলো “স্পর্শ এবং যোগাযোগ”। সাধারণ অ্যাকোয়ারিয়ামে কেবল কাচের ওপার থেকে মাছ বা তিমি দেখা যায়, কিন্তু ফুরেআই ল্যাগুনে দর্শনার্থীরা সামুদ্রিক প্রাণীদের খুব কাছে যেতে পারেন। এখানে একটি অগভীর পুল রয়েছে যেখানে সাঁতার কাটতে আসা ছোট ডলফিন বা বেলুগা তিমিগুলোকে আলতো করে স্পর্শ করার সুযোগ মেলে। এছাড়াও পেঙ্গুইন এবং সিলের খুব কাছ থেকে ছবি তোলার এবং তাদের খাওয়ানোর অভিজ্ঞতা নেওয়া যায়, যা শিশুদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়।

উমি ফার্ম
এটি সম্পূর্ণ একটি নতুন এবং শিক্ষণীয় ধারণা নিয়ে তৈরি করা ‘সামুদ্রিক খামার’। এখানে দর্শনার্থীদের সাগরের ইকোসিস্টেম এবং মাছ ধরা সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞান দেওয়া হয়। পর্যটকরা এখানে সরাসরি বড়শি দিয়ে মাছ ধরতে পারেন এবং সেই ধরে আনা তাজা মাছটিকে ওখানেই অবস্থিত রেস্তোরাঁয় নিয়ে গিয়ে ফ্রাই বা বার্বিকিউ করে খেতে পারেন। এটি জাপানিদের “খাদ্য ও জীবন” দর্শনের একটি চমৎকার উদাহরণ।
সামুদ্রিক প্রাণীদের শান্ত স্নিগ্ধ দুনিয়া দেখা শেষ হলে দর্শনার্থীরা চলে যেতে পারেন পার্কের অন্য প্রান্তে যেখানে অপেক্ষা করছে বুক কাঁপানো সব রাইডস। হাক্কেইজিমা সি প্যারাডাইসের প্লেজার ল্যান্ড অংশটি থ্রিল-লাভারদের জন্য নিখুঁত গন্তব্য।
সার্ফ কোস্টার লেভিয়াথান এই পার্কের সবচেয়ে আইকনিক রাইড। এই রোলার কোস্টারটির বিশেষত্ব হলো এর ট্র্যাকের একটি বড় অংশ সরাসরি সমুদ্রের পানির ওপর নির্মিত হয়েছে। ৬০ মিটারেরও বেশি উচ্চতা থেকে যখন এই রোলার কোস্টারটি ঘণ্টায় প্রায় ৭৫ কিলোমিটার বেগে সাগরের বুক ঘেঁষে নিচে নেমে আসে, তখন মনে হয় আপনি সরাসরি সাগরের পানিতে আছড়ে পড়তে যাচ্ছেন।
হাক্কেইজিমা সি প্যারাডাইসের সবচেয়ে অদ্ভুত এবং চমৎকার বিষয় হলো এই কৃত্রিম দ্বীপে বা পার্কে প্রবেশ করার জন্য কোনো প্রবেশমূল্য বা টিকিট লাগে না। আপনি চাইলে সম্পূর্ণ ফ্রিতে এই দ্বীপে প্রবেশ করতে পারেন, সমুদ্রের হাওয়া খেতে পারেন, বাগানে হাঁটতে পারেন এবং রেস্তোরাঁয় খেতে পারেন। আপনি কেবল যে অ্যাকোয়ারিয়াম বা যে রাইডে চড়বেন, তার জন্য আলাদা টিকিট কাটতে হবে।
বছরের বিভিন্ন সময়ে, বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে এবং বড়দিনের ছুটিতে হাক্কেইজিমা সি প্যারাডাইসে বিশাল আতশবাজির উৎসব হয়। মিউজিক এবং লেজার লাইটের তালে তালে সমুদ্রের আকাশের ওপর যখন হাজার হাজার রঙের আতশবাজি ফোটে, তখন সেই দৃশ্য দেখার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এসে ভিড় জমায়।
সন্ধ্যার পর পুরো দ্বীপটি হাজার হাজার রঙিন আলোয় সেজে ওঠে। সমুদ্রের শান্ত বাতাস, আলো ঝলমলে রোলার কোস্টার এবং চমৎকার রেস্তোরাঁগুলোর কারণে জাপানি কাপলদের কাছে এটি অন্যতম সেরা ডেটিং স্পট হিসেবে পরিচিত।
দ্বীপে বিশাল একটি ফুড কোর্ট এবং বেশ কিছু চমৎকার সি-ফুড রেস্তোরাঁ রয়েছে। জাপানি ট্র্যাডিশনাল সুশি, রামেন থেকে শুরু করে ওয়েস্টার্ন বার্গার সবই এখানে পাওয়া যায়। যারা একদিনে পুরো পার্ক ঘুরে শেষ করতে পারেন না, তাদের জন্য দ্বীপের ভেতরেই একটি চমৎকার হোটেল রয়েছে। এই হোটেলের রুমের জানালা দিয়ে সরাসরি ডলফিন পুল এবং সমুদ্রের দৃশ্য দেখা যায়।

পর্যটকদের জন্য ভ্রমণ গাইড ও টিপস
- টোকিও বা ইয়োকোহামা স্টেশন থেকে জেআর নেগিশি লাইনে চড়ে প্রথমে ‘শিন-সুগিতা’ স্টেশনে আসতে হবে। সেখান থেকে কানাজাওয়া সি-সাইড লাইনে চড়ে সরাসরি ‘হাক্কেইজিমা স্টেশন’-এ নামতে হবে। স্টেশন থেকে পায়ে হেঁটে দ্বীপে পৌঁছাতে মাত্র ৫ মিনিট সময় লাগে। টোকিও থেকে আসতে সব মিলিয়ে এক ঘণ্টার মতো সময় লাগে।
- যদি আপনি অ্যাকোয়ারিয়াম এবং রাইড দুটোই উপভোগ করতে চান, তবে একটি “One-Day Pass” কিনে নেওয়া সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হবে (প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য এর মূল্য প্রায় ৫,৫০০ থেকে ৬,০০০ ইয়েনের কাছাকাছি)। এতে আনলিমিটেড রাইড এবং সব অ্যাকোয়ারিয়ামে প্রবেশ করা যায়।
- শনি ও রবিবার এবং জাপানের সরকারি ছুটির দিনগুলোতে এখানে প্রচুর লোক হয়। শান্তিতে ঘুরতে এবং রাইডের লম্বা লাইন এড়াতে সপ্তাহের অন্য দিনগুলোতে সকাল সকাল চলে যাওয়া ভালো।
Reference:
- https://en.wikipedia.org/wiki/Yokohama_Hakkeijima_Sea_Paradise
- https://www.seaparadise.co.jp/en/index.htmlhttps://www.japan-guide.com/e/e3213.html
- https://www.yokohamajapan.com/things-to-do/detail.php?bbid=115
- https://www.japan.travel/en/spot/1576/
- https://en.japantravel.com/kanagawa/hakkejima-sea-paradise/4107

