জার্মানি দলে কিপারের সিরিয়াল পেতে পেতে বাউম্যানের ৩৬ বছর লেগে গেল ভাগ্যিস তিনি গোলকিপার ছিলেন, স্ট্রাইকার হলে তো ততদিনে অবসরে গিয়ে নাতি-নাতনিদের গল্প শোনাতেন!
জার্মানি দলে গোলকিপার হওয়া মানেই যেন এক অনন্তকালের অপেক্ষা! বছরের পর বছর ধরে বেঞ্চে বসে নয়ার-টের স্টেগেনের খেলা দেখে অবশেষে ৩৬ বছর বয়সে জার্মানির জার্সিতে অভিষেক হয়েছিল অলিভার বাউম্যানের। আর যখনই ২০২৬ বিশ্বকাপে এক নম্বর কিপার হওয়ার স্বপ্ন দেখছিলেন, ঠিক তখনই আবার নয়ার অবসর ভেঙে দলে এলেন! এই যে এত ড্রামা আর ট্র্যাজেডি, তবুও মুখে এক চিলতে হাসি নিয়ে দলের জন্য দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা অলিভার বাউম্যানের গল্প যেকোনো সিনেমার চেয়ে কম রোমাঞ্চকর নয়।

১৯৯০ সালের ২ জুন তৎকালীন পশ্চিম জার্মানির ব্রাইসাখ আম রাইনে জন্মগ্রহণ করেন অলিভার বাউম্যান। শৈশব থেকেই ফুটবলের প্রতি তার ছিল তীব্র টান। ২০০০ সালে মাত্র ১০ বছর বয়সে তিনি জার্মানির বিখ্যাত ক্লাব এসসি ফ্রাইবুর্গের যুব একাডেমিতে যোগ দেন। সেখানেই তার গোলকিপিংয়ের আসল ভিত্তি তৈরি হয়।
২০০৬ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে ফ্রাইবুর্গের অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে তিনি দারুণ জুনিয়র টুর্নামেন্ট জিতেন এবং তৎকালীন কোচদের নজরে আসেন। এরপর ২০০৯ সালে তিনি ফ্রাইবুর্গের দ্বিতীয় দলের হয়ে সিনিয়র ক্যারিয়ার শুরু করেন।
২০০৯-১০ মৌসুমের শেষ ম্যাচে বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের বিপক্ষে ফ্রাইবুর্গের মূল দলের হয়ে বাউম্যানের অভিষেক হয়। সেই ম্যাচে ফ্রাইবুর্গ ৩-১ গোলে জয়লাভ করে এবং বাউম্যান তার অসাধারণ রিফ্লেক্স দিয়ে শুরুতেই নিজের জাত চেনান।

২০১০-১১ মৌসুম থেকে তিনি ফ্রাইবুর্গের প্রথম পছন্দের এক নম্বর গোলরক্ষক হিসেবে নিজের জায়গা পাকা করে নেন। ক্লাবের হয়ে পরবর্তী চার বছর তিনি বুন্দেসলিগায় প্রতিপক্ষের বড় বড় আক্রমণের মুখে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছেন। ফ্রাইবুর্গের হয়ে ১৪৭টি অফিসিয়াল ম্যাচ খেলার পর তার ক্যারিয়ারে এক বড় মোড় আসে।
২০১৪ সালে অলিভার বাউম্যান চার বছরের চুক্তিতে টিএসজি ১৮৯৯ হফেনহাইমে যোগ দেন। ফ্রাইবুর্গ ছাড়লেও বুন্দেসলিগাতেই থেকে যান তিনি। হফেনহাইমে আসার পর বাউম্যানের ক্যারিয়ারের গ্রাফ কেবল ওপরের দিকেই উঠেছে। তিনি কেবল দলটির এক নম্বর গোলকিপারই হননি, বরং সময়ের সাথে সাথে ড্রেসিংরুমের সবচেয়ে বড় লিডার এবং পরবর্তীতে ক্লাবের প্রধান অধিনায়ক নির্বাচিত হন।

অলিভার বাউম্যানের দুর্দান্ত গোলকিপিংয়ের ওপর ভর করে হফেনহাইম তাদের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ এবং উয়েফা ইউরোপা লিগের টিকিট পায়। লিভারপুল, ম্যানচেস্টার সিটির মতো বিশ্বমানের দলগুলোর বিপক্ষে চ্যাম্পিয়নস লিগের মঞ্চে বাউম্যানের পারফরম্যান্স তাকে ইউরোপীয় ফুটবলে বেশ পরিচিত করে তোলে।
সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ বুন্দেসলিগা মৌসুমটি অলিভার বাউম্যান এবং হফেনহাইমের জন্য ছিল এক রূপকথার মতো। এই মৌসুমে বাউম্যান বুন্দেসলিগার ইতিহাসে ৫০০ ম্যাচ খেলার অনন্য মাইলফলক স্পর্শ করেন।

তার অসাধারণ নেতৃত্বে হফেনহাইম লিগ টেবিলে ৫ম স্থানে থেকে মৌসুম শেষ করে এবং ইউরোপা লিগের যোগ্যতা অর্জন করে। পুরো মৌসুমে বাউম্যান ৩৪টি ম্যাচেই মাঠে ছিলেন, ৯৮টি দুর্দান্ত সেভ করেছেন এবং ৭টি ক্লিন শিট রেখে দলের রক্ষণভাগকে আগলে রেখেছেন। হফেনহাইমের প্রধান কোচ ক্রিশ্চিয়ান ইলজার তার প্রশংসা করে বলেছেন: “বাউম্যান সবসময় পারফর্ম করে। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো, সে এত সফল হওয়ার পরও সবসময় মাটির মানুষ হয়ে থেকেছে, অত্যন্ত বিনয়ী এক চরিত্র।”
জার্মানির মতো দেশে যেখানে ম্যানুয়েল নয়ার এবং মার্ক-আন্দ্রে টের স্টেগেনের মতো গোলকিপাররা খেলেন, সেখানে অন্য যেকোনো ভালো কিপারের জন্য জাতীয় দলে জায়গা পাওয়াটা ভাগ্যের ব্যাপার। বাউম্যান ২০২০ সাল থেকে জার্মানির স্কোয়াডে ডাক পেলেও বছরের পর বছর ধরে তাকে বেঞ্চে বসে থাকতে হয়েছে।
অবশেষে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে উয়েফা নেশনস লিগে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ৩৬ বছর বয়সে জার্মানির জার্সিতে অভিষেক হয় বাউম্যানের। ক্যারিয়ারের শেষভাগে এসে দেশের হয়ে খেলার সুযোগ পেয়ে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন। এরপর ইতালির বিপক্ষে এক ম্যাচে দুর্দান্ত কিছু সেভ করে জার্মানিকে জিতিয়ে তিনি কোচ জুলিয়ান নাগেলসম্যানের মন জয় করেন।

২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপের ঠিক আগে জার্মানির প্রথম পছন্দের কিপার টের স্টেগেন ইনজুরিতে পড়লে নাগেলসম্যান ঘোষণা করেছিলেন যে, অলিভার বাউম্যানই হবেন জার্মানির এক নম্বর গোলরক্ষক। কিন্তু বিশ্বকাপের ঠিক আগমুহূর্তে হুলিয়ান নাগেলসম্যান আকস্মিকভাবে কিংবদন্তি ম্যানুয়েল নয়ারের আন্তর্জাতিক অবসর ভেঙে তাকে স্কোয়াডে ফিরিয়ে আনেন এবং সরাসরি এক নম্বর গোলকিপার হিসেবে ঘোষণা করেন।
ম্যানুয়েল নয়ার এক নম্বর হলেও, ৪০ বছর বয়সী নয়ারের ব্যাক-আপ এবং ড্রেসিংরুমের অন্যতম প্রধান ছায়া-নেতা হিসেবে ২০২৬ বিশ্বকাপে অলিভার বাউম্যানের অভিজ্ঞতা জার্মানির জন্য অন্যতম বড় শক্তি।
Reference:

